Updates

Home » ব্লগ » উপন্যাস » ভালবাসার জন্ম কোথা – ৩

ভালবাসা স্বর্গীয়-অমৃত এবং এর আধার নারী হৃদয়। পুরুষ ঐ আধারের ঢাকনা বিশেষ। আধুনিক ভালবাসা রাজ্যেও রাজা ও রাণীর প্রিয় সুগন্ধের (ইভ্ ইন্ প্যারিস) ছোট শিশিটী শৌর্যে ও প্রাচুর্যে যেমনি মন আকর্ষণ করে, নারীর অপরূপ রূপ লাবণ্যময়ী সুন্দর চেহারা খানিও তেমনি পুরুষের সমূহ চিন্তা অবসাদ জনিত দুঃখ রাশি ভুলায়ে সুখের স্বপনে মাতায়ে রাখে। বাইরের দুষিত-হাওয়া যেমন শিশিটীর ভিতওে ঢুকতে না পারে শিল্পী সেদিকে যথেষ্ট মনযোগ দিয়েই ঢাকনা (কর্কটা)অতি সুচারু রূপেই তৈরী করেছেন। দীন-দুনিয়ার মালিক বিশ্ব-স্রষ্টাও তেমনি নারীর স্বর্গীয় ভালবাসা আধারের সুন্দর ঢাকনা রূপেই পুরুষকে সৃষ্টি করেছেন। তাই নারী সে জামে-জামসিদের পেয়ালা এবং দখিন হাওয়ার মতই পুরুষ নেশায় ভরপুর।
স্ত্রী এবং পুরুষ সম্পূর্ণ বিপরীত মুখী কিন্তু একের জন্যই অন্যটি তৈরী। (স্ত্রী এবং পুরুষের) এদের চলার পথে শান্তি শৃঙ্খলা, পরস্পর সহায়তা ও সহানুভূতির নিত্য পুলক শিহরণ পরিবারস্থ শিশুদের কোমল প্রাণে সেই ঐশী অমৃতময়ী ভালবাসার ভাবধারা জাগায়ে তোলে। অতি শৈশব থেকেই তারা প্রকৃতির দিকে আকৃষ্ট হয় এবং স্বচ্ছ ভালবাসার মধুর আস্বাদ গ্রহণের ইচ্ছায় উপযুক্ত অবসর যৌবনের প্রতীক্ষা করে। কৈশোরের শেষ থেকে যৌবনের শেষ পর্যন্ত মানব জীবন শুধু একলা বলেই মনে হয়। তাই শূন্যস্থান পূর্ণ করতে বা মনের বদ্ধ আবেগ প্রকাশ করবার মত জায়গা খুঁজে বের করতে হয়। দু এক করে এই ভাবেই বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়ে পড়ে।

বন্ধু
চলার পথে মিলবে কত
বন্ধু শত শত,
কেউবা শুধু ক্ষণিক তরে
কেউবা মনের মত।
কুঁড়ি যখন মুকুলিত
অলি আসে ছুটে –
বিকশিত কুসুম বাগে,
মধু নিতে লুটে।
মধু যখন থাকবে নাকো
ফুরাবে সুবাস,
অলির সাড়া মিলবে নাকো
খুঁজেও বার মাস।
সময় হ’লে বহু লোকেই
বন্ধু সেজে আসে,
অসময়ে দেয়না সাড়া
থাকেও যদি পাশে।
বিপদ কালে ভাই ও আপন
খোঁজে শুধু ফাঁক,
কেউ বা কেবল চেয়েই থাকে
কেউ বা ছাড়ে হাঁক।
মনের মতন বন্ধু যে জন
বাধাও শত পেলে,
দূরদিনে সে বন্ধুরে তার
যায়না কভু ফেলে।

বন্ধুত্বে ব্যবধান বা স্বহস্তে বিষ পান
বন্ধুত্ব কথাটা শুনতেও যেমনি প্রণারাম, এর সুফলও তেমনি মধুর। আবার এই মধুময় বন্ধুত্বে যদি কিছুমাত্র ব্যবধানের ছায়া এসে পড়ে তো সে একেবাওে বিষময় হয়ে উঠে। এ কথার সত্যতা প্রমাণ করতে গেলে প্রথমেই দেখতে হয় বন্ধুত্ব শব্দের প্রকৃত অর্থকি এবং কাকে বলে?
বন্ধুত্ব শব্দটীকে বাংলা ভাষায় বিশেষণ বা কোন কিছুর গুণ প্রকাশক বলে। এখন কার গুণ প্রকাশ কওে তাই দেখতে হবে। বন্ধু এই মধুময় শব্দের। বন্ধুর অর্থ? এই শব্দটীতে তিনটি প্রধান অক্ষও আছে, যার প্রতিটিই এক একটি কওে দূর-প্রসারী গুঢ় সম্বন্ধ রাখে। ‘ব’ (বৈশিষ্ট) ‘ন’(ন্যায়-নিষ্ঠা) এবং ‘ধ’ (ধী-শক্তি)। তাই আমরা বুঝি উপরোক্ত ‘বন্ধু’ এবং তার গুণ প্রকাশের নামই বন্ধুত্ব। বন্ধু এবং বন্ধুত্বেরঅর্থ পাওয়া গেল, এখন দেখতে হবে কাকে বলে এবং কেমন করেই বা এর পরিচয় মিলে? উপরোক্ত গুণ সম্পন্ন দুটী আত্মাই পরস্পর বন্ধু, এবং তাদের কার্যাবলীই বন্ধুত্ব। পূর্বেই বলেছি বন্ধুত্ব যেমনি প্রাণারাম, তেমনি মধুর। কি করে তা হয়, একবার আলোচনা করা যাক। দুটী আত্মার পরস্পর মিলনই ক্রমে ক্রমে বন্ধুত্বেও পথে চালিত করতে থাকে। তবে কথা হচ্ছে ‘আত্মা’ লোহা এবং চম্বুকের মত জিনিস নয় যে খানিকটা দূর থেকে অথবা নিকটবর্তী হলেই একত্রিত হয়ে যাবে। তা ছাড়া ‘আত্মা’ মানুষের শরীরের অভ্যন্তরে থাকে, সে নিজে এত সহজে তাই আর একটা আত্মাকে সাথী করে নিতে পারেনা; অন্য আর একজনের সহায়তা দরকার করে। তার নাম ‘জবান’ বা বুলি অথবা ‘ভাষা’। মানুষ এই ভাষার অধিকারী বলেই সৃস্টিজগতের মধ্যে সেরা জীব, এবং ভাষা দ্বারাই সে নিজের মন-ভাব অন্যেও কাছে ব্যক্ত করবার সুযোগ পায়। এই ভাষা যতই শ্রুতি মধুর হয়, ততই সে অধিক পরিমাণে মানুষের (আত্মার) সঙ্গে শীঘ্র শীঘ্র পরিচিত হতে এবং আপনার করে নিতে পারে। তাই বন্ধুত্বের প্রধান এবং প্রথম “মশলা’ বা ‘উপকরণ’ হচ্ছে- শ্রুতিমধুর বা ‘ভাল-ভাষা’। শুধু ভাষাই শ্রুতিমধুর হলে বন্ধুত্ব হয়না, দু’টী আত্মার মধ্যে পূর্বোল্লোখিত তিনটি গুণ সমভাবে অথবা সামান্য কম বেশী কওে বিদ্যমান থাকা চাই। এছাড়াও বন্ধুত্বে ত্যাগ-স্বীকারই সবচেয়ে বড় জিনিষ। যারা এ সবগুলি ‘ফরমূলা’ মেনে চলতে পারে, তারাই বন্ধুত্বের পূর্ণ আস্বাদ পায়।
আর যারা ক্ষণিকের জন্য, স্বার্থ-সিদ্ধির জন্য, মিষ্টি-কথায় মন ভুলিয়ে বন্ধুত্বে বরণ করতে চায়, তারা বন্ধু নামের কলঙ্ক এবং এই বৃত্তিই শেষে তাদের স্বভাবগত পেশায় পরিণত হয়। তখন তারা আরও নতুন নতুন শিকার ধরতে পটু হয়। সুযোগমত তারা যৎসামান্য পকেট থেকে খরচ করতেও কুন্ঠিত হয়না। এই শ্রেণীর লোকের হাত থেকে সর্বদা সাবধান থাকা উচিত।
আজকালকার বাজাওে বন্ধু এবং বন্ধুত্বের অভাব নেই। তবে এইরূপ বন্ধু এবং বন্ধুত্বের শতকরা প্রায় আশি ভাগই দালালি এবং স্বার্থ পরতায় পূর্ণ। তা ছাড়া বন্ধুত্ব এক প্রকার নেশারই মত। বিড়ি-সিগারেট ইত্যাদি ধূমপায়ীদেও যেমন উহাব্যতিরেকে চলতে পারেনা,এই ম্রেণীর লোকদেরও তেমনি চুপ চাপ বসে থাকতে ভাল লাগেনা। সদাই তারা সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। নিজের বিবেক যদি তার সঙ্গে চলাফেরা(মেলামেশা) অতিরিক্ত আলাপ আলোচনা ইতাদি বন্ধুত্বের প্রথম উপকরণ যোগাতে রাজী না হয়, তবে আমার মনে হয় তারা দুঃখ পেলেও স্পষ্ট নিষেধ করে দেওয়া উচিৎ। এতে হয়তো ক্ষণিকের জন্য রোষাগ্নি জ্বলে উঠতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতে উভয়েরই পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। আশায়, আকাঙ্খায় এবং আফসোস আর কাল কাটাতে হয়না।
বন্ধুত্ব স্থাপনের পূর্বেই নিজের মনকে খুব শক্ত, বিশ্বাসী এবং সন্দেহ হীন কওে নেওয়া দরকার। তারপর কল্পিত বন্ধুর রূপগুণ, আর্থিক- অবস্থা, পরিস্থিতি, মনের গতি, মুখের – ভাষা, বিচার –বুদ্ধি, ন্যায়-নিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ে ভাল করে আলোচনা এবং তুলনা করে দেখা নিতান্ত আবশ্যক যেন ভবিষ্যতে কোন প্রকার ব্যাঘাত না ঘটে। কারণ মহাশত্র“ও অস্ত্রঘাতের চেয়েও ভীষণতর মনে হয় পরম বন্ধুর মুখের সামান্য অসংযত একটি কথা। মানুষ একাধারে বন্ধুর জন্য দুনিয়ার সব কিছু ত্যাগ, এমনকি নিজের মহামূল্য জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে তৃপ্তি পায়, পক্ষান্তরে এরূপ দৃষ্টান্তও জগতে বিরল নহে যে- পরম বন্ধুই শেষে চরম-শত্রুর পালা গ্রহণ করেছে।

Leave a Reply

Categories

%d bloggers like this: