News Updates

Home » ব্লগ » পুস্তক » তিন ঘন্টার ইতিবৃত্ত

এফ,স্কট ফিটজেরাল্ড
ডোনাল্ডের মনে হল সে যেন একটা ক্লান্তিকর কাজ করে এসেছে। তার ফুর্তি এবং বিরক্তি দুই’ই লাগছিল এখন। একটা অদ্ভুত সুযোগ এসেছিল আজ। হতে পারে সেজন্য সে নিজেকে এখন পুরস্কৃত করতে চাইচে।মধ্য-প্রাচ্যের কোন এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় বিমানখানাভূমি স্পর্শ করতেই সে নেমে পড়ল তারপর সেকালেররেড ইন্ডিয়ান রেলওয়ের মাল গুদামের মতস্বতন্ত্র পিবলো বিমান বন্দরের দিকে এগুতে লাগলসে জানে না সে মেয়েটি বেচে আছে কিনা; এমনকিসেই মেয়ে এ শহরে থাকে কি না তার বর্কমান নামকি তাও সে জানে না। শান্তভাবেই সে ফোন গাইড খুলে মেয়েটির বাবার নাম খুজতে লাগল- নাম, ফোন গাইডে লেখা ছিল বিচারপতি হারমন হোমস হিল সাইডঃ ৩১৯৪। টেলিফোনে তার কথার জবাবে একটা প্রফুল্ল নারী-কন্ঠ ভেসে এলোঃ”ন্যান্সি এখন আর মিস নয়,মিসেস ওয়াটার জিফোর্ড। আপনি কে?” ডোনাল্ডকোন জবাব না দিয়ে টেলিফোন ধরে কিচুক্ষণ দাঁড়ি-য়ে রইল। সে যা’জানতে চেয়েছিল জেনে গেছে। এখন হাতে মাত্র তিনঘন্টা সময়। ওয়ালটার জিফোর্ড নামে কাউকে ওর কিছুতেই মনে পড়ছে নাযখন ও ফোন গাইডটা দেখছিল তখন ওর মনে আর একটা সন্দেহ জেগেছিল। হয়তো ন্যান্সি শহরের বাইরে কোথাও বিয়ে করেছে। না, ওয়ালটার জিফোর্ডের নম্বর পাওয়া গেল। হিল সাইডঃ ১১৯১। ওর আঙ্গুলের ডগাগুলোতে রক্ত উঠে এলো।
”হ্যালো?”
”হ্যালো, মিসেস জিফোর্ড আছেন কি? আমি তার একজন পুরানো বন্ধু।”
মিসেস জিফোর্ড বলছি।”
ওর কথায় সুরের মজা আর যাদু ঝরে পড়ছে, অথবা ভাবছে তাই ডোনাল্ড।
”আমি ডোনাল্ড প্লান্ট বলছি। আমার বয়স যখন বারো বছর ছিল তারপর থেকে আর তোমার সংঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ নেই।
”ওহহো!”
সুরটা আশ্চর্যের অভিব্যক্তি তবে খুবই নম্র। ‘ডোনাল্ড তা থেকে পরিচয়ের স্বকিৃতি অথবা অনন্দ কোনটাই ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। “ডোনাল্ড!” স্মৃতির অতল হাতড়াবার চেষ্টা ছাড়াও আরও কিছু মেশানো ছিল সে স্বরে। ”এ শহরে কবে তুমি ফিরলে? কোথায় আছ তুমি?” এবার আরও আন্তরিকতার সুর।”আমি কয়েক ঘন্টার জন্য বিমান বন্দরে আছি।””বেশ তো এসে আমার সঙ্গে দেখা কর।””নিশ্চয়ই তুমি এখন ঘুমুতে যাচ্ছিলে না!””ওঃ না, না!” মেয়েটি চেঁচিয়ে উঠল। “আমি একাবসে বসে “হাইবল” খাচ্ছিলাম। তুমি একটু তোমার টেক্সিওয়ালাকে বল…।”পথে যেতে যেতে ডোনাল্ড কথাগুলো বিশ্লেষণ করতে লাগল। সে বলেছিলঃ ”আমি বিমান বন্দরেআছি।” এই থেকে এই প্রমাণিত হয় যে সে উঁচুঅভিজাত কোন পদে আছে। ন্যান্সির “একাকিত্ব” থেকে এটাই মনে হয় যে সে এখন আকর্ষণ শূন্য মেয়েতে পরিণত হয়েছে; হয়তো তার কোন বন্ধু-বান্ধবও নেই। তার স্বামী হয়তো বাইরে অথবা শুয়েপড়েছে। ডোনাল্ডের কল্পনার ন্যান্সি একটা দশ বছরেরমেয়েই ছিল। কিন্তু যখন মনে হল ন্যান্সির বয়স এখনতিরিশের কাছাকাছি তখন একটু হাসলÑসব স্বাভাবিকমনে হল। যাত্রা শেষে ডোনাল্ডের মনে হল আলোকিতদরজার সামনে গ্লাস হাতে কালো চুলের একটা ছোট্ট সৌন্দের্যের মূর্তি দাড়িয়ে।ডোনাল্ড গাড়ী থেকে নেমে মেয়েটিকে যথার্থ চিনেছে কিনা এই ভেবে শঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করল-“আপনিইমিসেস জিফোর্ড ?” মেয়েটি বারান্দার আলোর ভেতরদিয়ে বড় বড় চোখে নিরীক্ষণ করতে করতে এগিয়ে এলো। একটু হেসে আড়ষ্ট ভাবটা কাটাতে চাইলঃ “ডোনাল্ড; তুমি- আমরা সবাই বদলে গেছি। ওঃ এটা সত্যিই চোখে পড়ার মত!”। ওরা ভেতরের দিকে এল;ওদের কলকন্ঠ ঝংকার দিলÑ“এই বছরগুলোÑ”, আর ডোনাল্ডের পেটের ভেতরটা কেমন ঘুলিয়ে উঠল। মনেপড়ল ওদের সেই শেষ দেখা হয়েছিল যেদিনÑসেদিনের ছবি। ন্যান্সি সাইকেল করে ওর পাশ কাটিয়েচলে গিয়েছিল। এ যেন ঠিক কলেজের মিলনোৎসবÑকিন্তু কোলাহল আর ব্যস্ততার আড়ালে লুকানো ছদ্মবেশী অতীতকে ওরা খুঁজে পাচ্ছে না । ডোনাল্ডেরভয় হল ঘন্টা কটা একেবারে বৃথা না যায়আবার।তাই সে বেপরোয়া হয়ে কথাবার্তা শুরু করল।”তুমি সব সময় সুন্দর ছিলে। কিন্তু তবু আমি দেখে অবাক না হয়ে পারছি না যে তুম ঠিক তেমনি সুন্দরইআছ।”
কথাটায় বেশ কাজ হ’ল। এই সপ্রতিভ প্রশংসাটা ওদের দু’জনকে বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ করে তুলল এবঙ শৈশবের বন্ধুত্বের নানা স্মৃতির প্রতি হাত বাড়াবার দায় থেকে রেহাই দিল।
“একটু হাইবল খাবে?” ন্যান্সি জিজ্ঞেস করল। “খাবে না? বেশ, তবে দয়া করে এমন ভেব না যে আমি লুকিয়ে মদ খাই। আজকের রাতটা অদ্ভুত নীল।আশাকরেছিলাম যে আজ আমার স্বামী আসবে। কিন্তুসে তার করেছে যে আরও দু’দিন দেরী হবে আসতে।ডোনাল্ড, সে কিন্তু ভারী চমৎকার আর আকর্ষণীয়।রং, গঠণ এগুলো কিছুটা তোমার মতই।” একটু ইতÑস্তত করে সে আবার বললÑ“আমার মনে হয় নিউইয়র্কে কারোর প্রতি আমার স্বামী আকৃষ্টÑকিন্তু আমি তাকে চিনি না।”“তোমাকে দেখার পর কিন্তু কথাটা অসম্ভব বলে মনে হয়।” ডোনাল্ড ওকে আশ্বাস দিতে চাইল। “ছ’বছরআমি বিবাহিত জীবন যাপন করেছি। এক সময় আমিও ঐ রকম ভেবে নিজেকে কষ্ট দিতাম। তারপর একদিন আমি মন থেকে ঈর্ষা একদম দূর করে দিলাম।আমার স্ত্রী যখন মারা গেল আমি খুব খুশী হয়েছিলাম।সে একটা ঐশ্বর্যপূর্ণ স্মৃতি রেখে গেছে।”ন্যান্সি একদৃষ্টে ওর দিকে চেয়ে রইল, তারপর ওর মতই সহানুভূতির সূরে বললÑ”আমি সত্যিই দুঃখিত।”একটু পরে বলল,“তুমি কিন্তু খুব বদলেছ। তোমার মাথাটা ঘোরও তো। মনে পড়ছে বাবা বলতেনÑছেলেÑটার সত্যিই মগজ আছে।”তুমি নিশ্চয়ই সে কথার প্রতিবাদ করতে!”“না, আমার ভাল লাগত। তার আগে পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল সবারই মগজ আছে। সেই জন্য কথাটা আমার মনে লেগেছিল?” আর কি কি তোমার মনে লেগেছিল?”ডোনাল্ড মৃদু হেসে জানতে চাইল।ন্যান্সি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে একটুখানি ছটফটিয়ে হেঁটে বেড়াল। তারপর ওর কাছে এগিয়ে এসে বলল ”না! মিথ্যে বলবনাÑ আমার মনে হয় আমি তখন খুব দুষ্ট মেয়ে ছিলাম।”“না না তুমি তা ছিলে না।” ডোনাল্ড জোর দিয়েই বলল। ‘আচ্ছা হ্যাঁ-আমি এখন কিছু একটা পান করব।”
মদ ঢালতে ঢালতে ন্যান্সি ওর দিকে মুখ ফেরাল। ডোনাল্ড বলেই চললÑ“তুমি কি ভাবতে পারো যে তুমিই একমাত্র ছোট মেয়ে যাকে আমি প্রথম চুমু খেয়েছি।”
“এই প্রসংগ তোমার ভালো লাগছে?” ন্যান্সি প্রতিবাদ করল, তার ক্ষণকাল বিব্রত ভাবটুকু কেটে গেল। বললÑ“কি বাজে বকছ! আমরা তো মজা করেছি; আনন্দের গান গেয়েছি।”
“শ্লেজে চড়ে বেড়িয়েছি।”
“হ্যাঁ, ট্রডি জেমসের সেই বন-ভোজন! আর ফ্রনটেনাকের সেই গ্রীষ্মের দিনগুলো!”
ডোনাল্ডের মনে পড়ল সেই শ্লেজে বেড়ানোর সময় ওর হিম-শীতল গালে চুমু খাওয়া। তারপর যখণ ও পিঠ ঘোরালো সে ওর ছোট্ট ঘাড় আর কানে চুমু দিয়েছিল, কিন্তু ঠোঁটে কোনদিনও চুমু দেয়নি। আর ম্যাকসসেই পার্টির কথা মনে পড়ে -যেখানে সবাই ডাকঘর খেলছিল আর আমি মামস হয়েছিল বলে যেতে পারিনি।”Ñবলল ডোনাল্ড।
“সেকথা মনে পড়ছে না তো!”
“তুমি তো সেখানে গিয়েছিলে।তোমাকে অনেকে সেদিন চুমু দিয়েছিল আর তাই হিংসেয় আমি জ্বলে গিয়েছিলাম।”
“ভারী মজা তো! আমার কিন্তু কিছুই মনে পড়ছে না। হয় তো বা আমি ভুলে যেতে চাই।”
“কিন্তু কেন?” কৌতুকের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল ডোনাল্ড। আমরা সম্পূর্ণ অবুঝ ছিলাম। ন্যান্সি, আমি যখনই আমারস্ত্রীর কাছে অতীতের গল্প করতামÑবলতাম, তাকে যেমন আমি ভালবাসি ঠিক তেমনি তোমাকেও তেমনি বাসতাম। যখন আমরা শহরে বেড়াতে যেতাম বারুদের স্তুপের মত আমার বুকের ভেতরে থাকতে।”
“সত্যি তুমি অতোটা উত্তেজিত হোতে?”
“হায় খোদা, হ্যাঁ! আমিÑ” হঠাৎ যেন ডোনাল্ড বুঝতে পারল যে তারা পরস্পর মাত্র দু’ফুট দাঁড়িয়ে আছে সে এমন ভাবে কথা বলছে যে এখনও ওকে ভালবাসে, আর ন্যান্সিওতেমনি ঠোঁট দু’টো একটু ফাঁক করে দু’চোখে মেঘমেদুর দৃষ্টি নিয়ে ওর পানে চেয়ে রয়েছে।
“বল বলে যাও। আমার বলতে লজ্জা করছে, কিন্তু শুনতে আমার ভাল লাগছে। আমি তো জানতাম না তখন তুমি এত চঞ্চল হয়েছিলে। আমি ভাবতাম শুধু আমি নিজে চঞ্চল হয়েছি।
“তুমি!” ডোনাল্ড আর্তনাদ করে উঠলো। “মনে নেই তুমি সেই ওষুধের দোকানের সামনে আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলে; যাবার সময় জিভ ভেংচে গিয়েছিলে।” ডোনাল্ড হেসে উঠলো।
“ আমার একটুও মনে পড়ছে না। আমার তো মনে হয় তুমিই আমাকে ফেলে গিয়েছিলে।” ন্যান্সি আরতো করে ওর বাহু স্পর্শ করল। “ওপর তলায় আমার একটা ফটোর এ্যালবাম আছে। কত বছর ওটা আমি দেখিনি। এ্যালবামটা আমি বের করে আনছি।”
পাঁচ মিনিট বসে ডোনাল্ড শুধু দু’টো কথাই চিন্তা করল। একটা হচ্ছে যে এমন একই ঘটনা দু’জনেই মনে রেখেছে, যেগুলোর সংযোগ স্থাপন করা অসম্ভব। আর একটা হচ্ছেÑছেলেবেলায় ন্যান্সি যেমন করে ওকে কিছুই হারিয়েছে। জীবনের এই দ্বিতীয়ার্ধে মানুষ অনেক কিছুকেই পরিত্যাগ করে, কিন্তু সেই হারানোর অভিজ্ঞতায় তার তেমন কিছু আসে যায় না। বিচলিত করে তুলত, এখনও রীতিমত মহিলা হয়েও তেমনি করেই বিচলিত করছে। আধ গন্টার মধ্যেই ওর ভেতরেও একটা অদ্ভুত আবেগ সৃষ্টি হয়েছে। স্ত্রী মারা যাবার পর কখনও এমন আবেগ ও অনুভব করেনি এমন আবেগ যে আবার কোনদিন ও অনুভব করবে এটাও সে আশা করেনি।
একটা কৌচে পাশাপাশি বসে ওরা দু’জন ছবির এ্যালবামটা দেখছিল। ন্যান্সি ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে, মুখে মৃদু হাসি আর সুখের চিহ্ন।
“ওঃ কি মজা,” ন্যান্সি বলল, “তুমি কি সুন্দর আমাকে মনে রেখেছ। আহা! আমি যদি তখন একথা জানতে পারতাম। যখন তুমি চলে গেলে আমার খুব রাগ হয়েছিল তোমার উপর।
“লক্ষিটি ভুলে যাও সে সব!” ডোনাল্ড বলে উঠল।
“ এখন কিন্তু তা নয়,” ওকে সান্তনা দিল ন্যান্সি। তারপর আবেগময় সুরে বললÑ “আমাকে চুমু দাও, সবঠিক হয়ে যাব্.ে… এটা লক্ষী বউয়ের কাজ হল না যদিও” মিনিট খানেক পরে বলল ন্যান্সি। “ সত্যিই বিয়ের পর আমি আর কাউকে চুমু দিইনি।”
ডোনাল্ড উত্তেজিত হয়ে উঠলÑ কিন্তু সবই যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। সেকি ন্যান্সিকেই চুমু দিল ? অথবা শুধু একটা স্মৃতিকে চুমু দিল। না এই কাঁপন লাগানো মোহময়ী নারী, যে ওর দিক থেকে এখন দ্রুত চোখ সরিয়ে এ্যালবামের পাতা উল্টাচ্ছে, তাকে ? ডোনাল্ড বললÑ“দাঁড়াও, এখন এ্যালবাম রাখ। এই মুহূর্তে আমি কিছুই দেখছিনা! আহাঃ যদি আগের সেইদিন ফিরে পেতাম। আমি একটুও স্বস্তি পাচ্ছি না যে। আমরা আবার প্রেমে পড়তাম সেটা কি খারাপ হত!” ডোনাল্ড শেষ পর্যন্ত একটা বাজে কথাই বলে ফেলল।
“থামো!” হেসে উঠল ন্যান্সি, তবে প্রাণহীন সে হাসি। “ যা হবার তা হয়ে গেছে। সে এক উত্তেজিত মুহূর্তের ব্যাপার। আর সে মুহূর্ত এখন আমাকে ভুলে যেতেই হবে।”
“যাক তোমার স্বামীকে এসব কিছু বোলনা।
“কেন বলব না? সাধারণতঃ আমি তাঁকে সব কথাই বলে থাকি।”
“ এতে সে ব্যাথা পাবে। কোন পুরুষকেই এমন কথা কখনও বলতে নেই।”
“ঠিক আছে আমি বলব না।”
“ আমাকে আর একবার চুমু দাও লক্ষিটি।” ডোনাল্ড অসংলগ্নভাবে কথাটা বলে উঠল। কিন্তু ন্যান্সি এ্যালবামের একটা পৃষ্টা উলটিয়ে আগ্রহের সংগে একটা ছবি দেখতে দেখতে চেচিঁয়ে উঠলÑ“এই যে তুমি!”
ডোনাল্ড দেখল। ছবিটা হচ্ছে একটা ছোট ছেলের, হাফপ্যান্ট পরে জেটির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। পেছনে একটা নৌকা।
ইল্লসিত হয়ে হেসে ন্যান্সি বললÑ“যেদিন ছবিটা তোলা হয়, আমার মনে আছে সেদিনটা। কিটি তুলেছিল আর আমি এটা ওর কাছ থেকে চুরি করেছিলাম।”
ডোনাল্ড ছবিটা দেখে নিজেকে চিনতে পারল না। আরও ভাল করে ঝুঁকে দেখল ছবিটা তবু পারল না। বলল, “ওটা আমি না।”
“ও, হ্যাঁ। এটা ফ্রন্টেনাকে তোলাÑ গরমের দিনে আমরা প্রায়ই যে গুহায় যেতাম।”
“গুহাÑকোন গুহায় ? আমি তো মাত্র তিনদিন ছিলাম ফ্রন্টেনাকে।” ডোনাল্ড হলদে হয়ে যাওয়া ছবিটার ওপর আবার চোখ বুলাল “এটা আমার ছবি না। না না এটা ডোনাল্ড বাওয়ারের ছবি। আমরা কিছুটা এক রকমের দেখতে।”
ন্যান্সি ওর দিকে তীক্ষè দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। ওর কাছ থেকে এটু সরে যেতে চাইল। “ কিন্তু তুমি তো….তুমি তো ডোনাল্ড বাওয়ার্স!” ন্যান্সি উচ্চকন্ঠে আর্তনাদ করে উঠল! “না-না, তুমি নাÑতুমি তো ডোনাল্ড প্লান্ট।”
“সে কথা আমি তোমাকে ফোনেই বলেছি।”
ন্যান্সি তড়াক করে উঠে দাঁড়ায়Ñওর মুখে ঈষৎ ভীতির ছাপ।“প্লান্ট! বাওয়ার্স! আমি কি পাগল হয়ে যাব? তবে কি এটা মদের জন্যই হ’ল? আমি তোমাকে যখন প্রথম দেখলাম কেমন যেন দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। শোন, তোমাকে আমি কি বলেছিলাম ?”
ডোনাল্ড বইয়ের পাতা উলটিয়ে উলটিয়ে একটা শান্ত বৈরাগ্যভাব ফুটাতে চেষ্টা করল। “তেমন কিছু না।” বোলল সে।ফ্রন্টনাক-গুহা-ডোনাল্ড বাওয়ার্স অনেকের ছবিই তার সামনে ভাসছেÑঅথচ কোনটাই তার নয়।
ডোনাল্ড বললÑ“তুমিই আমাকে সেদিন ফেলে চলে গিয়েছিলে।”
ন্যান্সি ঘরের অপর প্রান্ত থেকে কথা বললÑ“এ গল্প তুমি কোথাও কখনও কোর না।”
“এর মধ্যে তো কোন গল্প নেই!” ডোনাল্ড ইতস্ততঃ করে বলল। তাই বুঝি সে তখন বলেছিল ছোট বেলায় খুব দুষ্ট ছিল সে। ডোনাল্ড ভাবল মনে মনে।
হঠাৎ এ্যালবামের সেই ছোট ডোনাল্ড বাওয়ার্সের ওপর ওর ভীষণ হিংসে হল অথচ সে নিজের জীবন থেকে একদিন ঈর্ষাকে বিষর্জন দিয়েছিল। দীর্ঘ পদক্ষেপে ন্যান্সির দিকে এগিয়ে গেল ডোনাল্ডÑ এই কয়েকটি পদক্ষেপের চাপেই সে যেন গত বিশটা বছর এবং ওয়ালটার জিফোর্ডের অস্তিত্ব ভেঙ্গে গুড়িয়ে ফেলবে।
ন্যান্সির চেয়ারের হাতলের ওপর বসে তার কাঁধে হাত রেখে ডোনাল্ড বললÑ“ আমাকে আবার একটু চুমু দাও ন্যান্সি।”
কিন্তু ন্যান্সি সরে গেল। বললÑ“তুমি না বলেছিলে, তোমাকে আবার আবার এক্ষুনি বিমান ধরতে হবে।”
“ওটা কিছু এমন দরকারী না এখন। ইচ্ছে করলে আমি ওঠাতে নাও যেতে পারি।”
অত্যন্ত হিম শীতল কন্ঠে বলল ন্যান্সিÑ“তুমি যাও দয়া করে ভাবতে চেষ্টা কর আমার কেমন লাগছে।”
ডোনাল্ড চীৎকার করে উঠল-“তুমি এমন ভাব দেখাচ্ছযেন আমাকেমনেই করতেপারছ নাÑযেন তুমিডোনাল্ড প্লান্টকে চেনই না।”
“আমি চিনি । তোমাকেও আমার মনে আছে। কিন্তু সবই বহু আগের কথা।” ন্যান্সির সুর আবার কঠিন হয়ে এলোÑ“তোমার ট্যাক্সির নম্বরÑক্রেষ্টউড ৮৪৮৪।”
বিমান বন্দরের দিকে যেতে যেতে ডোনাল্ড দুপাশে মাথা ঝাকালো। এখন সে সম্পূর্ণ নিজের মধ্যে রয়েছে তবুও যেন ঐ অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণভাবে হজম করে উঠতে পারছে না।
বিমানটা অন্ধকার আকাশের বুকে গর্জন করে উঠল আর তার ভেতরের একত্রিত যাত্রীরা যে যার পৃথক সত্ত্বায় বিভক্ত হয়ে গেল।
পাচঁ মিনিটের জন্য তার দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে রইলÑসে যেন পাগলের মত দ’ুটো পৃথিবীতে এক সঙ্গে বেঁচে রইল। এক জায়গায় সে একটা বার বছরে ছোট ছেলে আর একজায়গায় একজন বত্রিশ বছরে পুরুষ-দু’জনেই অসহায় ও অবিচ্ছিদ্য। দু’দফা বিমান ভ্রমণের মাঝের তিনটে ঘন্টায় ডোনাল্ড অনেক কিছুই হারিয়েছে। জীবনের এই দ্বিতীয়েির্ধ মানুষ অনেক কিছুকেই পরিত্যাগ করে, কিন্তু সেই হারানোর অভিজ্ঞতায় তার তেমন কিছু আসে যায় না।

Leave a Reply

Categories

%d bloggers like this: