News Updates

Home » ব্লগ » উপন্যাস » ভালবাসার জন্ম কোথা – ৫

নং বাড়ী আসাম

বেলা এক প্রহর হবে। সে দিন ভারতরাজ (১৯৪৬) ইংরেজদের বড়দিন, অফিসাদী বন্ধ। মোহিত একদৃষ্টে চেয়ে আছে – জানালা দিয়ে রেল লাইনের দিকে। জীবনে সবচেয়ে কাম্য এবং প্রিয়তম জিনিষ হারানো অনুতাপ অথবা অজানা দেশের রাজকুমারীর (রূপকথার গল্প) রূপসূধা কল্পনামগ্ন বলেই তাকে মনে হয়েছিল। হঠাৎ কখন অদ্বিতীয় বন্ধু শরীফ এসে ঘরে ঢুকেছে তার সেদিকে খেয়াল নেই। মোহিতের তৎকালীরন মৌনতা ভাঙ্গতে শরীফের সাহস হলোনা- যেন সে কালের গৌতমের পুনরাগমন হয়েছে আসামের জঙ্গলে। ধীরে ধীরে সে মোহিতের পিছনে এসে চুপটি করে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে লাগলো এবং কতক্ষণে কিভাবে তার ধ্যান ভাঙ্গে বাসে ধ্যানের সাধু উদ্দেশ্যই বাকি তা আবিষ্কার করার কৌতুহল শরীফকে অচল অটল পাথরে পরিণত করে ফেললো। এর কারণও যথেষ্ট ছিল। মোহিত কোনদিনই কোন সময়েই এরূপ ভাবে নিশ্চল হয়ে বসে ভাবতে পারে সেরূপ ধারণা তার তৎকালীন বন্ধু মহলে কারো জানা ছিলনা।
যুদ্ধের হিড়িকে সবাই ছেলে বুড়ো সবই তখন খুব সজাগ এবং সচকিত থাকতো। আর মোহিত ছিল, বন্ধু মহলে অনশন- অনুতাপ- অভাব দূরী করণের একমাত্র কবচ। তার সুগঠিত দেহ, সুললিত স্বর-লহরী বন্ধু মহলে এক অভিনব রূপ-রসের সৃষ্টি করতো। তার্পিত-জর্জরিত মর্মাহত বন্ধুদের এমন কি সাধারণ পরিবারের দুখেও সে জাতি-বর্ণ-ধর্ম নিবিশেষে ঝাঁপিয়ে পড়তো তাদেরকে প্রকৃতিস্থ করে তুলতো। সেই মোহিতই আজ ঘরের কেণে, উদাস হয়ে বসে ভাবছে এতে যে কত ব্যাথা বা আনন্দ নিহিত আছে-তা বুঝবার মত শকতি –বুদ্ধি শরীফের বা অন্য কোন বন্ধুর ছিলনা। অদম্য কৌতুহলের বশেই শরীফ মোহিতের স্বেচ্ছায় মৌন ভঙ্গের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে তার কুটির ৩ নং বাড়ীর বাঁশের ঝাপের খিড়কী নড়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে মোহিতের ধ্যান ভেঙ্গে গেল। পিছন ফিরে সে শরীফকে দেখতে পেলো। শরিফ অতীব আগ্রহের সাথেই তাকে জিজ্ঞেস করলো  এতক্ষণ ধরে কি ভাবছিলে বন্ধু ? এক মিনিটের জন্যও ফিরে চাইলে না পিছনে। মনে হয় কোন অমঙ্গল সংবাদ এসেছে দেশ থেকে অথবা কোন রূপকুমারীর হাতছানী তোমাকে সূদুরের পথে টেনে নিয়ে গিয়েছিল! কোনটা সত্য খুলে বল”।
অন্য মনষ্কের মতই মোহিত জবাব দিলো মনে হচ্ছে, অনেকক্ষণ আগেই তুমি এসেছ। না, কোন অমঙ্গল সংবাদ আসেনি দেশ থেকে খোদাকে ধন্যবাদ সে জন্য। আর কোন অমঙ্গল সংবাদ আমাকে এতদূর বিচলিত করতে পারেনা -সে ভরসা বোধ করি তোমাদের আছে। আমি আশ্চর্য হচ্ছি – এখানকার বর্তমান – কালের হাল-চাল দেখে। ভেবে কুল পেলাম না- এর মূল কতদূরে! আচ্ছা বলতে পারো সময়ের একি একটা নির্দয় পরিহাস? বসো ব্যাপারটা আগে ভাল করে শোন  পরে জবাব দিয়ো। তোমার সাথে পরামর্শ করাই যেন সঙ্গত বলে মনে হল- বেশীদূর গড়ান উচিত নয়। ভাবছিলাম- সেই ব্যাথার স্মৃতিগুলো- অতীতের সেই ছবির মত সাথীগুলোর কথা। এক একে কেমন করে তারা আমাকে দূরে বহুদূরে সরে যেতে সুযোগ দিচ্ছে।যাদের প্রতি কথায়, কাজে, সময়ে অসময়ে আমার উপস্থিত- অনুমতির দরকার হতো, আজ তাদেরই কাছে আমার সঙ্গটা যেন আর ভাল লেগে উঠছেনা। প্রতিনিয়তই তাদের নাগালের বাইরে যেতে আমাকে বাধ্য করা হচ্ছে। এমনকি শৈশবের স্নেহমাখা, কৈশোরের পুলক জাগানো, যৌবনের প্রাণ মাতানো প্রিয়তম ‘ রঙ মহল’ ৩ নং বাড়ীখানাও যেন আমাকে আর আশ্রয় দিতে চাইছে না।
বিছানা ছেড়ে মোহিত তার রঙ মহলের অন্দর-আঙ্গিনায় পায়চারি করতে লাগলো। কখোনো ধীরে চিবুকে হাত দিয়ে আবার সহসা মুষ্টিবদ্ধ করে জোর কদমে, আর অস্ফুটস্বরে কত কি বলে চললো। কখন বা উপরের দিকে চেয়ে হাত ইশারায় কাকে কি ইঙ্গিত করলো- শরীফ তার কিছুই বুঝলো না। কোন জন প্রণীকেও দেখতে পেলনা কেবল সেই বিরাট পাহাড়ে গাছটা অনন্তকালের হিসাব দেবার জন্যই যেন রান্না ঘরের পেছনে যমদূতের মত দাঁড়িয়ে আছে। সুমধুর স্বরে- প্রাণ-স্পর্শি ভাষায় বক্তৃতা দেবার বাহাদুরী মোহিতের ছিল- তার কথার মোহে পড়ে কত রকমের বন্ধু জুটেছিল, কথার প্যাচে পড়ে শত্র“ এবং উপরস্থরা পর্যন্ত সব সময়ে তাল সামলে উঠতে পারত না, এসব শরীফের জানা ছিল। কিন্তু একযোগে তার মনে হল, এক নিশ্বাসেই যেন মোহিত উপরের কথাগুলো বলে ফেললো। মনে মনে শরীফ তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলো এবং তার মত ক্ষুদ্র প্রাণীর দ্বারা যদি এরূপ বন্ধুর কিছুটা সাহায্য হয়, সে দৃঢ় মনে তা করবে স্থির করলো।
সহসা মোহিত আঙ্গিনা থেকে ফিরে এসে বলতে শুরু করলো ‘শোন শরীফ, তুমি আমার বন্ধু, অন্যান্য বন্ধুদের মধ্যে তোমার জায়গা অনেক উপরে একথা অন্যেরা যেমন স্বীকার করে, আমিও তেমনি করি। তাই বলছি সুদূর অতীতে শৈশবে এই রং মহলের কচিবুকে কত-ধূলা খেলা করতাম, তার স্নেহ মাখা সুশীতল পরশে আমার ক্ষুদ্র হৃদয় খানা আনন্দে, উৎসাহে ভরে উঠতো! অদূর কৈশোরের রঙিন-স্বপ্নগুলো ছবির মতই আমার চোখের উপর ভেসে বেড়াতো। এইতো সেদিন বলেই মনে হয় অন্যতম কিশোর বন্ধু মুজিরের কথা! তার সঙ্গে কত ঝগড়া –বিবাদ করেছি হয়তো রাগে অভিমানে দু’তিন দিন কথা বলিনি, আবার পরদিনই নবাগত অতিথিদের অভ্যর্থনায় লেগে গেছি। আজও বেশ মনে আছে তার সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম দিনটা! এই কামরাতেই একখানা পুরোন মিলিটারী খাটের উপর সে বসে আর আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হিতাকাঙ্খী এবং স্থানীয় অভিবাবক জ্যাঠামশাইও তারই পাশে বসে। উনি আমাদের উভয়কে পরিচয় করিয়ে দিলেন। উভয়ে মিলে-মিশে থাকতে অনুরোধ এবং আবশ্যক –মতে তাকে জানাতে বলে নিজের বাসায় চলে গেলেন। তখন এ কামরায় আমরাই দু’জন, উভয়েই নীরব নিস্তব্ধ। শত চেষ্টাতেও যেন সে নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে আলাপের সূত্রপাত করতে কেউই ভাষার সহায়তা পাচ্ছিনে। শেষে আমিই  বাড়ীর মালিকের দায়িত্ব এবং কর্তব্য নিয়ে আগন্তুক অতিথিকে সানন্দ অভিনন্দন জানাবার রীতিতে দু’চারটা কথা জিজ্ঞেস করলাম। সেও যথা সম্ভব সৌজন্য রক্ষা করেই জবাব দিলো। এক দুই করে আমরা পরস্পর এতটা স্নেহ-মমতায় জড়িয়ে পড়লাম যে নিকট বাসার সহোদরদের মধ্যেও সেরূপ সৌহার্দ দেখা যেতনা। ক্রমে ক্রমে উভয়ে যেন একই বৃন্তে ফোটা দুটি ফুলের মত এই রং মহলের ছায়ায় বেড়ে উঠতে লাগলাম। খুব সুখের মধ্যদিয়েই আমাদের কৈশোর-পূর্ণ-যৌবনের প্রথম সিড়িঁতে এনে পৌঁছাল”।
“ হঠাৎ একদিন কালো-ভ্রমরের মত একজন অতিথি এসে পড়লো। আমাদের আথিতেয়তা আন্তরিকতা নাকি তাকে খুবই মুগ্ধ করেছে।
তার সাথে পরিচিত হই। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা
rup কাহিনী। তোমার ডাগর কালে চোখ, কোমল পল্লব সফললা। আমরাও তাকে ভ্রাতৃtarহে আলিঙ্গন করে রাখলাম এই বাড়িতে। বেশ আনন্দেও সঙ্গেই দিনগুলো চললো। কিন্তু কালের করাল স্রোতে একে একে আগন্তুক বন্ধু দুটিই সরে পড়লো। নিরাশায় মন ভেঙ্গে পড়লেও- বাড়ী খানার গুণ মাহাত্ম্যে, তাদের বিরহ-বেদন বুকে চেপেই এতদিন একরকম নীরবে ছিলাম। তারা অনেক দূরে থাকলেও এই বাড়ীতে তাদের কীর্তিমালা আমাকে সে দূরত্ব বুঝতে দিতনা। তা ছাড়া, মাঝে মাঝে তাদের সুনাম সুযশ বিবরণী চিঠি আসতো এই বাড়ীতে। কিন্তু সেই পূর্ণ- স্মৃতি- বিজড়িত বাড়ীখানিই আজ আর আমায় চায়না। যার একটু খানি পরশে আমার সমূদয় সংসারিক তাপ-জ্বালা জুড়ায়ে দিতে যথেষ্ট চেষ্টা করতো, সেই-ই আজ দুঃখী বলে উপহাস করে আমাকে তার ছায়া থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়।
একদিন যে তার সমূদয় ঐশ্বর্য্য রাশি, সৌন্দর্য মালা, অকাতরে আমাকে বিলীয়ে দিয়ে শান্তি পেতো, সেই ই আজ অন্যের ঐশ্বর্যেও সৌন্দর্যেও লোভী, কি ভীষণ মহাপরিবর্তন! আমূল উৎপাটন !! হায়রে লোভী, স্বার্তান্বেষী মোহন্ধ জগৎ! তুমি কি একে বারেই পাষাণ! একটি বারও ভুলে ফিরে চাও না অতীতের পানে কি ছিলে আর হয়েছ বা চলেছ? তোমাকে কত রকমে মনমত করে গড়ে তুলেছি। মনোমুগ্ধ কর ফুলে- নিত্যাবশ্যকীয় ফল-মূলে সুসজ্জিত করে তুলেছি – নিস্বার্থ ভাবে! এই কি তার প্রতিদান”?
একটা দীর্ঘ নিশাবাস ফেলে মোহিত যেন হাপাতে লাগলো। তার সাথে পরিচয়ের পর আজই প্রথম শরীফ তাকে বিহ্বল হতে দেখলো। এর আগে কোনদিনই তাকে এতটা উতলা-উন্মনা দেখেনি এবং এরূপ অবস্থা তার ধাতে কোথাও লুকানো ছিল বলেও শরীফের ধারণা ছিলনা। তাই অন্তরঙ্গ – বন্ধুর আকস্মিক –বিপদে সেও অতিশয় দুঃখ এবং মনোবেদনা অনুভব করতে লাগলো। যদিও সে বুঝলো না মোহিতের কোথায় এতটা এবং কিসের ব্যথা – তবুও তার কথাগুলো এমনি দরদভরা যে শরীফ মুখ ফুটে কিছুই বলে তাকে সান্তনা দেবার সাহস পেলনা  বোবার মতই বসে রইলো।
মোহিত আবার শুরু করলো  “ হিংশুক, পরশ্রীকাতর ধিক তোর প্রাণে! শত ধিক তোর অস্তিত্বে! ভেবে দেখ একবার আমার আগে তোর কাছে কে আসতো? কতকগুলি গরূ -ছাগল মুরগী ছাড়া, এখানে মানুষের পায়ের ধূলো সহসা পড়তো না। আর আমারই যত্নে রচা সোনার রং মহল বলে এ বাড়ী পরিচিত – কত শত শত অতিথি সম্ভ্রন্ত পরিবার এখানে আসার জন্য ব্যকুল! শেষে কিনা লোভের দায়ে আমাকেই সরাতে রাজী হয়ে গেলি। ভাল কথা, আমি বিদায় নিয়ে যাচ্ছি  তুই তো সুখে থাক। আমার অদৃষ্টে অন্যত্র এর চেয়ে ভাল মিলতেও পারে। আর না মিললেও দুঃখ নেই  জীবন ভরেই যে দুঃখের বোঝা বয়ে চলেছে কাউকে জানতে দেয়নি, তার আবার দুঃখ কি সে? কি বল হে শরীফ? চল এবার এদের সাহচার্য ছেড়ে কোন নতুন জায়গায় যেয়ে আস্তানা গড়া যাক – কেমন? বল শুনি তোমার কি মত”!
“ বলছি ভাই, কিন্তু তোমার মত এতটা সুন্দর করে গুছিয়ে বলতে আমার ক্ষমতায় কুলোবে না। তবুও যতটা পারি, যতটুকু বুঝি বলছি – শুনে কি ভাববে তুমিই জান,  আপাতত পাগলামী বলে উপহাস করো না”।

প্রেমময়ী ভালবাসা
প্রেম – পবিত্র, স্বর্গীয় জিনিষ, খোদার দান। অসীম দাতা এবং দয়ালু আল্লাহতা’লার দয়ালু নামের মাহাত্ম্য রক্ষার জন্যই এই প্রেমের সৃষ্টি। আল্লাহ তা’লা মানব তথা-সৃষ্টি -জগতের , এক কথায় সারা মাখলুকাতের সৃষ্টিকর্তা, পালন এবং সংহার কর্তা। তাঁরই ইঙ্গিতে জীবকুল তাদের আহার্য় পেয়ে জীবন ধারণ এবং সৃষ্টি কর্তার শোকরিয়া আদায় করে থাকে। মানুষ –সৃষ্ট – জগতে শ্রেষ্ঠ – সৃষ্টি  খোদার পেয়ারা নবীগণ এই মানব -জাতির
স্তম্ভ হয়ে পৃথিবীতে আসেন- তাঁর পবিত্র নাম গান শিখাবার জন্য। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব- আদর্শ পুরুষ- হজরত মোহাম্মদ(সঃ) এই মানব সমাজেই পৃথিবীতে স্বর্গের অমর কাহিনী রেখে গেছেন- শিক্ষার জন্য!
দয়ালু আল্লাহতা’লা তাঁর মহিমা প্রকাশের জন্য, দুনিয়ায় মানবের সুবিধার জন্য যা’কিছু দরকার হয় এবং তৎসমূদয় সৃষ্টি করেছেন। তাঁর এ দানে কোনরূপ কার্পণ্য বা হিংসা নেই। তাঁর ইঙ্গিতে চাঁদ-সুরুজ প্রত্যেহই নিয়মিত পৃথিবীর সবজায়গাতেই আলো দেয়, বাতাস জীবের জীবন রাখে। এই ভাবে যত বেশী আলেচনা করা যায় ততই বেশী চোখে পড়ে সে দান।
পৃথিবীর আদি মানব হজরত আদম (আঃ) সেই দয়াময়ের ইচ্ছাতেই বেহেশত থেকে পৃথিবীতে আসেন। আদম (আঃ) সৃষ্টির পরই তাঁর মনোরঞ্জনের জন্য বিবি হাওয়কে সৃষ্টি করেন। সুন্দরী সাথী পেয়ে আদম(আঃ) খোদার কাছে শোকর করেন। পৃথিবীতেও তারা উভয়েই আসেন, এবং তাঁদেরই মহামিলনে দুনিয়াতে মানুষের বংশ উৎপন্ন হয়। স্ত্রী-পুরুষ তাই স্বর্গীয় ইচ্ছায় একত্রিত হতে থাকে এই মিলন বৈধ এবং শুদ্ধ হলেই খাঁটি প্রেম বলে। এই প্রেমই পরিশেষে খোদাপ্রাপ্তির পথে অমূল্য সম্বল হয়ে থাকে। কোন “উচুঁ গাছে অথবা পাহাড়ে যেমন সহজে উঠা যায়না সিঁড়ি দরকার হয়, তেমনি মহান সৃষ্টি কর্তার নাগাল পেতে হলে সিঁড়ি দরকার। সিঁড়ির ধাপগুলি যদি পাশেই সুন্দর ও মজবুত ভাবে লাগান থাকে- হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যাবার ভয় থাকে। পেমের পথের সিঁড়ির প্রথম ধাপ তাই স্ত্রী জাতি। খোদা তাদিগকে পুরুষের পাশে এমনি করে গেথেঁ দিয়েছেন যেন ইচ্ছা করলে উভয়ে মিলে আকাশে উঠতেও পারে এবং দরকার বশতঃ অতল-গভীরতার মাঝেও ঝাপিঁয়ে পড়তে পারে। মজবুত গ্রন্থি যুক্ত-অচ্ছেদ্য বন্ধন অভেদ আত্মার পরিণতই ইচ্ছে প্রেমময়ী ভালবাসা। এই প্রেম, খোদাপ্রাপ্তি অতি –সহজলভ্য ব্যপার নহে এবং পার্থিব ঐশ্বর্যের বিনিময়েও তা মিলে না। ধৈর্য, সততা এবং একনিষ্ঠার ফলেই এ প্রেম লাভ হয়। জগতে এরূপ দৃষ্টান্ত বিরল। আদি মানব হজরত আদম (আঃ) এবং তাঁর জীবন সঙ্গিনী হাওয়া বিবি বেহেশত থেকে পৃথিবীতে আসার পথে তারাঁ বহুদূরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এই মহান প্রেমের টানেই তারা সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর পরে আরাফাতের ময়দানে পুনরায় মিলিত হন। তাদের এই মিলন খুশীর শোকরিয়া আদায় করবার জন্যই আজও আদম সন্তান নানারূপ বাধাবিঘn সয়ে অর্থ ব্যয় করে সেই ময়দানে হাজির হয়ে থাকেন। এই প্রেমের শিখায় জ্বলেই ‘দেওয়ান মজনুন উপাধী লাভ করেন কায়েস।
স্ত্রী এবং পুরুষের মধ্যে পরস্পরের মন-মিলনই সংসারে বিবাহ বলে পরিচিত। দোওয়া বা মন্ত্র পাঠ ইত্যদি অনুষ্ঠান শুধু একটা বাহ্যিক আড়ম্বর – সামাজিক আচার এবং সেই ভাগ্য নিয়ন্তার কাছে উভয়ের চিরস্থায়ী মিলনে সাহায্য প্রার্থনা করা। আসলে মনেই যদি মিল না হয় হাজার রকমে অনুষ্ঠান করলেও সে বিয়েতে সুখ শান্তি নেই। লোক – লজ্জায়, দায়ে পড়া হয়ে অনেকে হয়তো ঐ ভাবে ঘর –সংসার করে থাকে। কিন্তু সেখানে স্বর্গীয় শান্তির লেশ মাত্র নেই। আর বেশীর ভাগই দেখা যায় অত্যাচার ,অবিচার ও ব্যাভিচারের পালা এবং পালটা আক্রমণ। মিলনের বদলে অমিলই সেখানে উল্লেখযোগ্য। চরিত্র – মেজাজ এবং জন্মগত অধিকারই মানুষকে সংসারের পথ – চালক। স্ত্রী – পুরুষের মিলনে এই তিনটি জিনিষই তীক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করা উচিত। আংশিক ভাবে কমবেশী হলে তেমন কিছু ক্ষতি হয়না। তবে পরিমাণ সীমা অতিক্রম হলেই তাদের মিলনে ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। এই অধ্যায়ে একটা সামান্য সামাজিক অসামঞ্জস্য নিয়ে একটা ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। আমীর ও শরীফা শরীফা! প্রাণের সারু !! এসো , এদিকে এসো, – একটিবার এদিকে ফিরে চাও! কি, চাইবেনা ? কেন? তুমি না মেয়ে মানুষ , মেয়েদের অলংকার কি? তুমিই না বলেছিলে  “মেয়েদের অলংকার, তাদের সবচেয়ে প্রিয় এবং কাম্য জিনিস  দুনিয়া ও জান্নাতের সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু – তাদের পরান – পিয়ারা প্রিয়তম”! সে কথা কি আজ ভুলে গেছো, না আমাকে প্রতারণা করছ, অথবা আরও রহস্যময় জালে আটকাতে – না আমার ভালবাসার ওজন বুঝতে কিংবা আমার ধৈর্যের বাঁধ – সীমা কতদূর দেখবার জন্যই আজ তুমি এতরূপে আছ! সত্য করে বলো – আমি আর একলাটি থাকতে পারছিনা। ধৈর্যের বাঁধ আমার শিথিল প্রায়  ভয় হচ্ছে – পাছে সীমা পর্যন্ত না পৌঁছতেই হয়তো প্রবল বন্যার বেগে আমার বালুর বাঁধ ভেঙ্গে যায়। পরক্ষণেই তারি বিগত নয় বছরের চেখের পানিতে – হৃদয়ের নিগুঢ় – প্রেমের সিমেন্টে, ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের কনক্রিটে এবং বিশ্ব – নিয়ন্ততার উপর পূর্ণ তোয়াক্কেলের ভিত্তিতে গড়া ছোট্ট কুটীর খানি ভেঙ্গে – চুরে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। বন্যার স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমরা উভয়েই দূরে –বহুদূরে সরে পড়বো। তাই ভয়ে, হতাশায় আজ মাঝপথে এসে তোমাকে স্মরণ করছি। রাণী আমার  দেবী –আমার জবাব দিও।
যাকে একদিন তোমারই পাশে রেখেছিলে, যাকে ছেড়ে দু’দন্ড থাকতে পারতেনা, যার মন যোগাবার জন্য কতই না আদর আব্দার জান – সুখে সংসারের সমুদয় তাপ-জ্বালা ভূলে পারিবারিক তথা ইসলামের খেদমতে তোমার অনুসরণকারী দিগকে সেই সত্য-সনাতন পথ চলতে শিখাবে বলেছিলে, আজ তাকেই কেন দূরে ফেলে সুখী হতে চাইছ? খোদা বেহতর জানেন আমাকে ছেড়ে থাকতেই তুমি বেশী সুখ অনুভব করছিনা! তোমার প্রতি এমন কোন অন্যায় ব্যবহার তো কোনদিন আমি করিনি। তবে কিনা তুমি তুমি বড় লোকের মেয়ে ধনীর প্রসাদের দুলালী, আজন্ম সুখের পিয়ারী! গরীবের হাল-অন্তর তুমি ততটা বুঝতে পারেনা। তুমি হয়তো বলবে তোমার প্রতি ভালবাসা আগের মতই আমার থাকবে তবে তোমাকে ছেড়ে বিদেশী হয়েছি কেন এবং কেমন করে? এর মূলে কি গুঢ় রহস্য রয়েছে তা কি তুমি একটুকুও জাননা? সবটা না জানলেও এটুকু বেশই জান যে- গরীবের সংসার এবং প্রতিটি পদক্ষেপেই সীমাবদ্ধ। আজন্ম দুঃখের নিগড়ে গরীবের হাত পা বাধাঁ। সেই সীমাবদ্ধ সংসারে ভুলের মাশুলরূপে কোন শিশু যদি স্বর্গের বার্তা বয়েও আনে তবুও প্রকৃতির কঠোর শাসনের হাত সে এড়াতে পারে না।
আমি বিশ্বাস করি- তুমি ধনীর ঘরে জন্ম নিলেও গরীবের জন্য তোমার অন্তরে -মমতার পাহাড়ী ঝরণা-ধারা বিরাজ করে। তাদের জন্য তুমি বেহেস্তের হুর-সদৃশ্য- তাদের সুখ-দুখের অনুভব ও মোচন-কারিনী। তুমি হয়তে আজও ভুলনি কেন আমি তেমাকে ফেলে দূরে পড়ে আছি, কেমন করেই বা তোমার ‘জুদাই’ সইছি। আমাদের শেষ বিদায়ের দিনটিও বোধ করি এখনও তোমার নয়নপটে আর ছায়া আনতে পারেনি। যেদিন তোমার বিরহ-রোদন সহ্য করা আমার পক্ষে অসম্ভব বলেছিলাম মনে পড়ে কি জবাব তুমি দিয়েছিলে? পুরুষ হয়েও- কঠিনতার ছাপ বুকে চেপেও সেদিন হাসি তোমারই প্রেমে আত্মহারা হয়ে দুনিয়ার রীতি ও কর্মফল ভূলে অন্ধের মতই তোমার সঙ্গ কামনা করেছিলাম। তুমিই না সেদিন নারীর প্রাণ ও প্রেম, আবেগ-ভরা ভালবাসার জ্বলন্ত-উদাহরণ জগৎকে দেখাবার জন্য আমাকে অনন্ত দয়াময় জগৎ-পিতার হাতে সপেঁ, হাসি মুখে বিদেশে পাঠিয়েছিলে। তোমার সে তেজোময়ী সান্তনা-বানী আজও আমার কানে বেজে ওঠে।
পুরুষকে সত্যিকারের পুরুষের মত কঠিন, হৃদয়বান, ধৈর্যশীল, বিপদে সাহসী, খোদার উপর আস্থা, তাঁর রাসুল (সঃ) তাঁর ইয়ার-আসহাব, কোরণ পাক, ফেরেশতা ও শেষ বিচারের দিনের উপর পূর্ণ ঈমান রেখে পথ চলতে আমাকে অনুরোধ জানিয়েছিলে। তোমার চির আকাঙ্খিত বস্তু দুনিয়ার সামগ্রী গরীবের গরীবতা, দুখীর দুঃখ, দুর করবার জন্য আমানতের মান, প্রাণহীনের প্রাণ, নিধনীর ধন, কুসংস্কার এবং কুসংস্কারীদের সংস্কার ফিরিয়ে দিতে, এই নশ্বর ধরাধামে অবিনশ্বরতার ভিত্তি স্থাপনের জন্য মুক্তা – শুক্তি অর্থ, জ্ঞান এবং আদর্শ লাভের জন্যই না আমাকে দূর দেশে পাঠিয়েছিলে! খোদার ইচ্ছায় ও তোমার একান্ত প্রাণের আকুল প্রার্থনার ফলে আজ আমি কামিয়াবির পথে প্রথম সিড়িতে পদার্পণ করতে সুযোগ পেয়েছি। আশা করি মাহবুবের (সঃ) নেক দোয়ায় অচিরেই উপরে উঠতে পারবো। আজ যেন ঘোর অন্ধকারের বুক চিরে শুভ্র আলোকের সন্ধান পেয়েছি নেশায় মেতে, তোমার সে অভয় বাণী স্মরণ করে সামনে ছুটে চলেছি। সুদীর্ঘ নয়টী বছর যে কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে তা একমাত্র খোদা ছাড়া কেউই জানে না। তোমার কোমল প্রাণে দারুণ ব্যাথা পাবে বলেই তোমাকে কোনদিনই লিখিনাই। তোমাকে কত ভালবাসতাম তা প্রকাশ করবার মত শক্তি আজও পাইনি। আজ আমি অনেক দূরে এসে পড়েছি। শৈশবে, কৈশোরে পেরিয়ে যৌবনের সিড়িতে উঠেছি। বাইরের জগতে তেমনি একটা তুমুল পরিবর্তন ঘটেছে। বোধ করি তোমার চাপার কলের মত সুন্দর মুখখানি এখন ইরানী গোলাপের মতই মন-লোভান-প্রাণ মাতানো হয়ে উঠেছে। কত সুখে আরামে সাথীদের সাথে তুমি দিন কাটাচ্ছ। তোমাকে ছেড়ে আসার পর দশটা মাস আমার খুবই কষ্টেই কেটেছিল। দিন রাত শুধু তোমারই স্মৃতি বিদায় বেলার সেই শেষ চাউনি, ও শেষ কথাগুলোই আমাকে ব্যাকুল করে তুলতে। বুকে ব্যাথা চেপে রেখে সমাজে হেসে কথা বলতে কতটা যে বেগ পেতে হতো তা আমিই ভাবতে পারিনি। অবশেষে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে, পুরেনো কথা সব জোর করে ভুলে যাবার জন্য নতুনত্ব সংগ্রহে ছুটোছুটি শুরু করে দেই। সেই ছুটোছুটির মধ্যদিয়েই প্রতমে কিছুটা শান্তি অবশ্য পেতাম। কিন্তু পরক্ষণেই তোমার কথা উথলে উঠে। অনন্ত দুখের সাগরে ভেসে যেতে হতো। চোখের সামনে ভেসে আসতো এক অপরূপ লাবন্যময়ী দেবী, প্রেমের পূজারিনী শরীফারানীর বেশে। কলম্বাসের মতই আকুল আগ্রহে চেয়ে দেখতাম সে মুখ কমলের তুলনা হয়না, তার আলুলায়িত মুক্তবেণীর দোলা, রক্ত জবা, সদৃশ্য ডাগর চোখের চাহনি, ইরানী গোলাপ তুচ্ছকারী কপোলের শোভা, আজানু লম্বিত প্রিয় পরশ আকাঙ্খিত বাহুলতার সুকোমল ছোঁয়াচ আমাকে সেই দুঃখের সাগরেও যেন কলম্বাসের মত এক নতুন রাজ্যের পথ দেখাতে ভেসে চলতো সাথে সাথে।
শরীফা রাণী! হঠাৎ তোমার স্মৃতির সুরভী ভেসে এসে এ ভাঙ্গা প্রাণে এক নিদারুন আঘাতই করল। তাই আজ আর চুপ থাকতে পারছিনা। একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তোমাকে বিরক্ত করতে হচ্ছে। আমার এ কথাগুলো হয়তো তোমার মনে বেসুরো লাগবে। কিন্তু উপায় কি? ভাষার দিকে লক্ষ্য করার মত শক্তি সাহস আর নেই। আমার সরল প্রাণ ক্রমশই আরও সরল হয়ে উঠছে। তুমি বেশ জান, আমার প্রকৃতি। একদিন তুমিই না বলেছিলে উঃ কি পাষান! কি কঠিন তুমি! কারো বুক ফেটে খুন বেরুলেও তুমি ফিরে চাওনা, কারো চোখবেয়ে রক্ত বেরুলেও তুমি ফিরে চাওনা, কারো চোখ বেয়ে রক্ত-আছঁ গড়ালেও তুমি একটা আফসোসের নিঃশ্বাস ফেল না। সেদিন তোমার কথার জবাব দিতে কোন ভাষারই সহায়তা পাইনি। নীরবেই কথাগুলি সেদিন শুনে ছিলাম। তুমি ভেবেছিলে আমি কিছুই বুঝিনা। বুঝলেও প্রতিকারের কোন সঙ্গতিই আমার ছিলনা। কিন্তু তখনই তুমি নিজেকে বশে আনতে শিখ নাই তোমার কোমল প্রাণে অতটা বোঝা পড়া করেও শেষে জয়ী হতে পারেনি। তুমি বুঝ নাই যে, পাষাণেরও প্রাণ আছে। কঠিন পাহাড়ের বুক ফেটেও স্বচ্ছ ও সুগন্ধি পানির ফোয়ারা নিয়ে ঝরনা কখন, কিভাবে ছুটে যায় প্রবাহে সৃষ্টি হয় শত শত মাইল ব্যাপী সুগভীর, খরস্রোতা, পুত সলিলা স্রোতস্বিনী। যার স্পর্শে জীবকুলের আকুলতা দূর হয়, ধরীত্রি শস্য শ্যামলা হয়। ও মৃত প্রায় বৃক্ষরাজিও ফুল ফল-ভারে সজ্জিত-গর্বিত হয়, প্রয়ণাবেগে অলি-ফুলের সুমধুর গুঞ্জন ধ্বনিতে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে।
প্রকৃতির লীলা –পালাক্রমে ছয় ঋতু বিরাজ করে। কিন্তু মায়াবিনী পৃথিবীর মায়া জালে আবদ্ধ জীব ঋতুর পরিবর্তন, তার উপকারিতা, অপকারিতা শিক্ষা সবটা সব সকল ভালভাবে বুঝেনা বা বুঝতে চেষ্টা করে না। প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথেই পৃথিবীর সংশ্রবীদের ও স্বভাবতই পরিবর্তন দেখা যায়।সেদিন তোমার মনের পৃথিবীতে প্রথম গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপই পরিলক্ষিত হয়। তুমি গ্রীষ্মাতিশয্যে অন্যের হৃদয়ের গোপন ভাবটুকু বুঝতে পারনি। তাই উপহাস ছলে বলেছিলে ‘কাদের পরিবর্তনে মনের পরিবর্তন নিছক একটা প্রলাপ বাক্য মাত্র। মন একটা বিশুদ্ধ পাত্র বিশেষ। প্রকৃতির দুষিত বায়ূ তাকে কলুষিত করতে পারে না। মন চিরদিনই অপরিবর্তনীয়। একান্ত আশ্বস্ত চিত্তে ঐ লাবণ্যময়ী চেহারাটাকে এ ভাঙ্গা বুকের কোণে চেপে নিরবে বেরিয়ে পড়েছিলাম সুদুরের পথে ভবিষ্যতের আশা নিয়ে। মনে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল একদিন হলেও মরণের আগে তোমাকে আমার কাছে পাব আপন করে ভাবতে পারবো। ওই আকুল আশাই আমাকে এত দুখের মাঝেও জিইয়ে রেখেছে। সত্যি বলতে কি তোমার ঐ ছবি খানি ছাড়া আমি আর কাউকে আপনার বলে জানিনাই দেখি নাই। যতই সুন্দরী যুবতী দেখেছি প্রত্যেকটার সঙ্গে তোমার তুলনা করেছি। তোমার স্থান তাদের চেয়ে অনেক উচ্চে। তোমার কারো তুলনা হয়না শুধু তোমার স্মৃতিই আমাকে আকুল করে তুলেছে।
সত্যি রাণী! শুধু তোমারই কথা ভেবে, তোমারই সঙ্গ লাভের আশায় আমি স্কুল থেকে শুরু করে বাড়ীঘর-মা-বাবা-আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধব-দেশ- দেশবাসী সবই ছেড়ে এসেছি। জননীর চেয়েও আদরের ও মায়ার বাঁধন মাতৃভূমি- তাকেও হারিয়েছি-শুধু তোমাকে হৃদয়ে স্থান দিয়ে। তোমাকে ভালবাসতে পারলে যে আমি কতট সুখী হতাম তা’ যদি তুমি জানতে তবে আর আমার আজ কোন দুঃখই থাকতো না। তোমাকে ভালবাসতে চাওয়া আমার উচিত কিনা তা’ জানিনা। তবে বেশ ভালই জানি শুধু আমিই যদি ভালবাসতে চাইতাম তবে আজ তোমাকে আর এতটা ক্ষত-বিক্ষত হতে হতো না। আমি বহুদূরে তোমার অবস্থা চোখে দেখার ক্ষমতা নেই। তোমার অন্তরের যতটুকু জানি আপাতত মুখ দিয়ে স্পষ্ট কথাটা যদি শুনতে পেতাম তবে আজ এরূপ ভয়চকিত হতাম না। সত্যই যদি তুমি আমার আশায় পথ চেয়ে থাকো- তবে এই মর-জগতেই তোমার ভালবাসা আমাকে অমর করে রাখবে। আর যদি সে আশা থেকে আমাকে পরিশেষে বঞ্চিত করো তবে আমার নাম ঠিকানাই বাকী থাকবেনা কোথায় ভেসে অথবা জ্বলে-পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো।। তোমার চিন্তায় আমার সব অর্থ অনর্থের মূল। আজ তেরো বছর ধরে যা সয়েছি এবং সইতেছি তারও মূলে তোমার ঐ মোহিনী মূর্তির চিন্তা। যদি কেউ অবিশ্বাস করে তাতে ক্ষতি নেই, তোমার চিন্তা করেই যে আমি এতটা করছি এই-ই আমার একান্ত গর্বের বস্তু।
তোমার ঐ চারু চাহনির মোহিনী আকর্ষণ দেখেছিলাম প্রথমে অর্নিলার চপল চাওয়ায়। স্কুলের পড়ার ফাকেও আমাদের আলাপ আলোচনা হতো। আমাদের সে প্রাণের টান পূর্ব প্রসঙ্গেই হিংসুক দুনিয়ার চোখে তীরের মত বেধেঁছিল। তারা সে বিশেষ জ্বালা সইতে না পেরে তিন বছরের মধ্যেই আমাদিগকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো। তোমার ঐ সরল অন্তকরণের কোমল মধুর ভাষার কিঞ্চিৎ আভাষ পেয়েছিলাম আমপারার কন্ঠে প্রতম ফাতেহা দোযাজ দোহামের রাতে। আমাদেও চাল-চলন গতিবিধি সে জালিম যুগের ধেড়ে মুরুব্বিদিগকেও এমনই এক ভ্রান্তির পথে টেনে নামাল যে একটা বড় রকমের দুর্নামের কালি মাথায় চাপিয়ে আসন্ন মৃত্যুর সামনে এগিয়ে যেতে সাহস করেছিলাম। সে মৃত্যুগহবরের তোমার ঐ মোহিনী শক্তি অকেজো হয়নি। সেখানেও অনেদৃশ্য অধরে মৃদুল বায়ের মত হাসিও প্রথমে দেখেছিলাম তারই ঠোঁটে। সে এক পর্ব বিশেষ, যার শেষ অঙ্ক অভিনয় করতে কত হৃদয়ের তন্ত্রীতে আঘাত লেগে শেষে তার পর্যন্ত ছিড়ে গিয়েছিল।
কত কাহিণী, পরিচ্ছদ প্রবাহ অতিক্রম করে এলো সুখের বার্তা নিয়ে এক নতুন জাগরনী সাড়া- আজাদ পাকিস্তান? মরহুম আল্লামা ইকবালের স্বপ্ন, শেখ মুজিবের বইয়ের পাতার প্লট নেমে এলো সোনার ভারতের বুকে-কায়েদে আজমের অটুট এবং অটল সিদ্ধান্ত। দুশো বছরের গোলামী জিঞ্জির ছিড়ে ফেলে ভারতবাসী স্বাধীন হলো-আমরা পাকিস্তানের রঙিন স্বপ্ন বাস্তবে রূপায়িত দেখার জন্য আকুল আগ্রহে দিন গুনতে লাগলাম।
প্রকৃতির পরিবর্তনে হঠাৎ একদিন রওনা হলাম চিরতরে দেশের দিকে। কিন্তু গাড়িতে অত লোকের ভিড়ের-খুশীর মধ্যেও আমার মনে তৃপ্তি ছিলনা পুরেপুরি। মনে হচ্ছিল কাউকে যেন অনেকখানি ঘায়েল করে এসেছি। পরক্ষণেই ভাবছিলাম- আজাদ পাকিস্তানের ভাবী আজাদী জীবন, আমরাও শ্বেতকায়দের মতই বুক ফুলিয়ে নিঃসংকোচে চলতে পারবো। দেশের দুর্দিনে ঘাবড়ে না পড়ে মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবো শত্র“র বিরুদ্ধে। হঠাৎ একটা ব্যাকুল হাওয়া গাড়ির এক জানালা দিয়ে ঢুকে অপর জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেলো লাইনের পাশের কমলা-বাগানের দিকে। সে হাওয়ার শন্-শন্ শব্দ যেন আমাকে একরূপ উপহাস করেই ছুটে বেরিয়ে গেল। কমলাক্ষেতে বেয়ে যেন তার উপহাসের মাত্রা বেড়ে গেল- কমলার পাতাগুলি তার কথায়সায় দিয়ে ঝর ঝর শর শর শব্দে হেসে উঠলো। বুকের মধ্যে যেন একটু খোঁচা পেলাম। মনে পড়লো- গত বিকেলে মিতালীর করুণ চাঊনি-সাথে একটা অসহ্য বেদনা জড়িত মুখঝাঁকনি। ষ্টীমারে উঠার আগে পর্যন্ত থেকে থেকে সে ছবিখানির চোখের সামনে নিত্য-নতুন সাজে, নতুন নতুন তরকারী-ফল-মূল নিয়ে যেন এসে হাজির। হঠাৎ কুলিদের কোলাহলে চমক ভাঙ্গলো গাড়ি ঘাটের কিনারে-স্টীমারে উঠবার জন্য সবাই ব্যস্ত। অগ্যতা আমিও উঠলাম।
সুরের রেশ ব’য়ে অবশ্য আনলো-সুরের দেশে নব লব্ধ-পাকিস্তানে। কিন্তু সে সুর কিছুদিন পর্যন্ত বেসুরই কাটলো। পরে সে সুরে প্রাণ দিলো নুরু। নতুন নতুন কত রংয়ের জীব, রকমারি ভাব-ভাষা দেখলাম, কিছুতেই মন ভরে উঠলোনা- আগের মত। মাঝে মাঝে বড়ই ব্যাকুল হয়ে পড়তাম। নতুন জায়গা-খুব ছোট্ট- কোন অন্তরঙ্গ সঙ্গী না পাওয়ায় মনটা বিষিয়ে উঠলো। খোদার মহিমা! অল্পদিন পরেই হাবিবের দেখা পেলাম। সে তার নতুন কুটিরে দাওয়াৎ করে গেল। অফিসের কাজে এক সময় তার সঙ্গে দেখা করে বদলী হয়ে আসবার রাস্তাটাও একটু পাকা করা হল। কিন্তু ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। একরকমই জোর করেই ফিরে গেলাম। নানারকম গোলমালে মাস দুই কেটে গেল। হঠাৎ এক শুভ চাঁদনী রাতে (শবে- রতে) চীরদিনের জন্য সে সুরের দেশকে শেষ বিদায় জানায়ে পাড়ি দিলাম আলোকের পথে। হাবিবের আড্ডাতেই ডেরা ফেললাম।
কিছুদিন পরে- সে আলোর পথে এলো এক ভুলো নাম গোত্রহীন, এক কৃশাঙ্গী শ্যামা। দাদু ডাকে সাড়া দিতেই-যেন চমকে উঠলাম। হাবিবের একান্ত দয়াপরবশেই তার দিকে নজর দিতে হলো। কারণ তার জন্মকাহিনী অদ্ভুত, এক গরীব গাড়ীওয়ালা তাকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিজের মেয়ের মতোই পালন করছে। কিন্তু অদৃষ্টের এমনি পরিহাস ভুলোর দুখানা লুঙ্গী ও একটা জামাতো দূরের কথা- দুবেলা দুমুঠো খাবার দেবার সামর্থই তার পালক-পিতার ছিলনা। তাই সে আমাদের পানি উঠানো কাজে বহাল হলো। এমনি করে বছর
খানেক যেতে না যেতেই ভুলো যেন তুলোর মত হয়ে উঠলো।
ভূল বুঝনা রাণী! কারো গুণ বর্ণনা করা দোষের নয় যদি প্রকৃত গুণ তার থাকে। তার গুণের মধ্যে পেয়েছিলাম-নির্লোভ এবং তোমা গুণের মতই গুনগুনিয়ে, কালো ঠোঁটের ফাঁকে মুক্তামালার মত চকচকে দাঁতগুলি ঈষৎ বের করে সুর ভাঁজানো। প্রথমে তার প্রতি যতোটা ঘৃণা আমার ছিল এই দুই গুণে তার অনেকটাই কমে গেল। সে আমাকে দাদা বলেই ডাকতো। দরকার মত সাধ্যমত তাকে কিছুটা সাহায্যও আমরা করতাম। হঠাৎ একদিন তার বাবা আমাকে দাওয়াৎ দিতে এসে বললো-পরশু ভুলোর বিয়ে-যদি দয়া করে তাকে কিছু সাহায্য করেন। তার কথায় বেশ একটু আশ্চার্য হলাম- এক বছর আগে ভুলোকে এক মুঠো ভাত আধখানা রুটি কেউ দেয়নি, আর আজ তাকে সারাজীবন খাওয়া-পরার দেয়ার অঙ্গিকারে কে বিয়ে করতে এলো? চমৎকার বিধান এই বিশ্ব নিয়ন্তার? ভেরেচিন্তে জবাব দিলাম-চেষ্টা করবো। নির্দিষ্ট দিনে তার বিয়ের নিয়ে পৌঁছলাম। রাতে বিয়ে হয়ে গেল হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম, খোদা এক দায় থেকে মুক্তি দিলেন।
পথের ধারেই আমি বাসা বেধেছিলাম। প্রতিদিনই সে পথ দিয়ে স্কুলের সময় কে যেন যাতায়ত করতো। মাঝে মাঝে খিড়কী পথে আমার তৎকালীন সাথী ‘মে ফারেক’ সাথে আলাপ করতো এবং চকিতে আমাদের উভয়েরই অলক্ষ্যে এক নিমিষ আমার দিকে চেয়ে নিতো। তখনও সে আমার সাথে কথাবার্তা বলে না-কিন্তু মনটা যেন কিছু বলার জন্য আঁকু-পাঁকু করে বেড়াচ্ছে-তা তার ভাব দেখেই বেশ বুঝতে পারতাম। কারণ তার চাচাজানের সঙ্গেই আমি কাজ করতাম-অন্যতম সহায়তারূপে! তিনিও তাই আমাকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। কাজেই সে নাম না-জানার সাথে আমি আলাপ করতে যেন একটু সংকোচই বোধ করতাম। এইভাবে কিছুদিন চলার পর বাতাস ফিরে গেল। আমর বিমার এমই সংক্রামক যে তার সংস্পর্শে আসলে যে কোন শ্রেণীর এবং সুস্থব্যক্তিই আক্রন্ত হয়ে পড়ে। সে নাম না জানারও হল তাই। মেফারের সাথে আলাপ করতে করতে হঠাৎ দেওয়ালে টাঙ্গানো কীর্তি দেখলো। সেখানে বহু কিছুই ছিল যা দেখে সে মোহাবিণ্টহয়ে পড়লো। সবচেয়ে ভাল লেগেছিল তার একখান ছবি-যাতে লেখা ছিল যে ফুল ঝরিয়া গেছে গন্ধ নাহি দিয়-পাবে কি সুবাস তার বাতাসে খুজিয়া?এর পর থেকেই সে যেন আমার পিছনে উঠে পড়ে লাগলো। তার নামও বলরো- কোথায় কি পড়ে তাও জানালো। ক্রমে ক্রমে আন্তরিকতা এমনি গাঢ় হয়ে উঠলো যে বিকেলে বাসার পিছনেই নদীর পাড়ে আমরা মুখোমুখি বসে মূদু অনুরূপ, সময়োচিত শ্লোক আবৃত্তি করেই সন্ধ্যার আনন্দটা উপভোগ করতাম। তারই ইচ্ছানুযায়ী তার নামের পিছনটা ছেঁটে সামনে কিছুটা যোগ করা হল। এই যোগ বিয়োগের ফলে নামটা এতই সুন্দর মধুমাখা হয়ে উঠলো যেন ছোট্ট নদীর বুকেও তার দোলা লাগলো। সত্য সত্যই সে ভালবাসার সুধাভান্ড হয়ে পূর্ণ ‘মমতাজ’ রূপে প্রকাশ পেলো। তার সাহচার্য, আলাপ আমাকে যেন মোহাবিষ্ট করে তুললো। তার সমস্ত খুটিঁনাটি সবকিছুই লক্ষ্য করে এমনই প্রেরণা পেলাম, যা শুধু তোমার কচি প্রাণে প্রথম দিনে পেতাম। মমতাজের চলার ভঙ্গি, বলার বাহাদুরী, নীরবে কথা হজম করার শক্তি ক্রমেই যেন আমাকে উদভ্রান্ত করে তুললো। তার কালো – চোখের মনিতেই যেন তোমার সেই শিশু ছবিটি ভেসে বেড়াতো। তার কচি লাউয়ের ডগার মতো লম্বা হাত দুখানির পরশ, সেই বিগত দিনের স্মৃতিই মনে জাগাতো। সে আমাকে এতটা ভালবাসে ফেললো যে কথাটা শীঘ্রই প্রচার হয়ে পড়লো। কিন্তু সে আমার মধ্যে কতটুকু পেলো বা নাপেলো তা তলিয়ে দেখবার সময় তার ছিলনা। সে বুঝতে চেষ্টা করলো না যে আমি তাকে কেন এবং কেমন ভাবে ভালবাসি। অবশ্য তাকে খুশী করতে আমি কোদিনই ত্র“টি করিনি, তাকে হাসি মুখে দেখে তোমার স্মৃতি মনে রাখবার জন্যই তার ইচ্ছামত যথাতথা গিয়েছি। কিন্তু পরিশেষে যখন তার অবস্থা অতি শোচনীয় হয়ে পড়লো, তখন বাধ্য হয়েই তাকে রাজধানীর দিকে সরিয়ে দেওয়া হলো বটে, কিন্তু কোন সুফলই তাতে হলনা। ক্রমশ সে ভেঙ্গে পড়তে লাগলো। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে যেন কিসের অনুভব করতে লাগলো। হঠাৎ সুদুর থেকে তা কাছে যাবার দাওয়াৎ এলো- পিতার মারফৎ, তার বড় ভাইয়ের বিয়েতে। কর্তব্যের খাতিরে, ইজ্জতের ভাবনায় আমরা যে অপরাধী নই প্রমাণের জন্য এবং সবচেয়ে গুঢ় কথা বহুদিন পরে খুশীর মৌশুমে প্রিয়জন মিলনের ইচ্ছা নিয়েই গিয়েছিলাম। কিন্তু আড়ম্বরের মধ্যে তার সাথে প্রাণ ভরে দুটি কথা বলার ফুসরৎ হলোনা। ব্যাকুলতা নিয়েই ফিরে এলাম। পরে জানা গেল তারও অবস্থা অনুরূপ।
এরপর আর আমাদের ভাগ্যে সাক্ষাৎ ঘটেনি শুধু হস্তাক্ষর ছাড়া। মাঝে মাঝে সে এমন প্রাণ সস্পর্শ ভাষায় লেখে যে আমাকে তড়পিয়ে উঠতে হয়। তার শেষ চিঠির শেষে একটা চুমু দিয়েই ইতি করেছিল। বহুদূর থেকেই যেন আমি তার উষ্ণ ঠোটের পরশ পাশেই অনুভব করেছিলাম। জানিনা মমতাজ আমার বাস্তব জীবনের সাথীরূপ অথবা কল্পালোকে এসেছিল। কিন্তু আজ প্রতিদিনই যে দাহন আমি সয়ে চলেছি এর বিরাম আছে কিনা জানিনা। এতা সুখ-দুখের মাঝদিয়ে, কত দেশ ঘুরে এলাম সাথী পেলাম ছেড়ে এলাম কিন্তু তৃপ্তি পেলাম না? আমার এঅবাধ মেলা মেশায় তুমি হতাশ হবে না, আমাকে ঈর্ষা ভরে দূরে ঠেলে ফেলে দেবে না তা আমি জানি। তুমি নিজেই আমাকে সে অনুমতি দিয়েছিলে আমার উপরেও তোমার ভরসা ছিল বলে। কিন্তু রাণী! সত্য বলবে কি-আর কতদিন, এভাবে পানির কিনারে বসে পিয়াসে ছাতি ফেটে যায় অথচ তৃষ্ণা নিবারণ নিষেধ? শুধু তোমার অনুমতির অপেক্ষায় আমি আছি। যে কোন জায়গায় যে অবস্থাতেই আমি তোমার ঈঙ্গিত পাই-পাহাড় নদী মরু না মেনে হজির হতে পারে। এ বিশ্বাস খোদা আমাকে দিয়েছেন। আশা করি, তুমিও এতে দ্বিমত কর না।
প্রেমের পূজারিনী, শরীফা রানী! আমার প্রতি তেমার অচল অটল বিশ্বাস, তেমার ঐ সুরভীমাখা চিঠিগুলেই যেন আমাকে সেই সসীমের দিকে টেনে নিয়ে চলছে। মনে হচ্ছে খুব শীগগিরই আমরা বহুদিন পরে আবার একত্রিত হবো। সেই ফুলবন, সেই সন্ধ্যাতারা আর মলয় বায়ূ আমাদের সে মহামিলনে খুশীর তুফান বইয়ে দিবে। কবে সেদিন আসবে তা বলতে পার রাণী? আমি বলতে পারি-সে দিন খুবই নিকটে এবং আমাদের মিলনে বাধা দেবার ক্ষমতা তোমার গুরুজনদের অগাধ অর্থরাশি বিপুল জনস্রোত অসীম জনসেবার কল্যানেরও নেই। আমরা উভয়ে মিলবোই যেহেতু বিশ্ব সৃষ্টিকর্তার ইঙ্গিতে আমরা এই তমন্নার গুলবাগে এসেছি। সময় হলে আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবো-কেউয়েই আমাদের এ যাত্রায় বাধা দিতে পারে না। কত সুখের হবে সেদিন দুনিয়াবাসী দেখবে সে সুখ, হিংসুখ জ্বলে পুড়ে মরবে কিছু বলতে পারবে না।
প্রিয় প্রিয়তম, র্হদয়ের নির্ভৃত প্রাণের গোপন সাথী! হে আমার নয়ন মনি, দুঃখী দিলের আশা- মুহুর্ত মাত্র দেরী করো না। আমি দুনিয়ার মায়াজালে আজ আবদ্ধ। যা ভেবে তোমাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম জালিমেরা তার বিপরীত ভাবলে- তার প্রতিদানে আমাকে তারা এক ধনীর ঘরে বেচতে চলেছে! আর সময় নেই, তোমার ধন- ভরসা। যে আমার হৃদয় দেবতা! তুমি যেখানেই থাক, মান, শক্তি- সাহস কিছুরই প্রত্যাশী আমি নই-শুধু একটিবার দেখা পেতে চাই।
বিশ্বাস করো প্রিতম! তোমার উপদেশ আমি অবহেলা করে দুনিয়ার ধনে –মানে সুখীহতে যাবো না। তাদের সব চেষ্টাই বিফল হবে, আমি দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ হয়ে শুধু তোমাই পথ চেয়ে আছি। তোমার জন্য আত্মহত্যা করতে হলেও তা আমি করবো এবং সে ব্যবস্থাও আমি করে রেখেছি। ভুল বুঝনা যেন! তাদেও মতে ধনীর ঘরে যাবার চেয়ে- তোমার সাথে পাতার কুঁড়েঘর এমনকি পথে-জঙ্গলে কাটাতেও রাজী। তারা যদি একান্ত মোহান্ধ হয়েই জের করে আমাকে সেখানে পাঠাতে চায়, ভাল কথা! তারা যে শুধু আমার অদৃষ্টের পরিহাস-মাখা লাবণ্যময়ী দেহখানাই পাবে-তাতে প্রাণ পাখী আর থাকবে না। খালি খাঁচা নিয়েই তারা টানা-হিচড়া করবে। তবে আফসোস শুধু তেমার জন্য। যাবার আগে, শেষ বিদায়ের আগে তোমার চেহারা একবার দেখে নেবার সাধ থামছে না। তোমার সবল বাহুর আবেষ্টনীর মাঝে একটিবার মাথা রেখে নয়ন ভরে দেখে নিতে ইচ্ছে হচ্ছে। অন্তিম কাল শেষচিহ্ন, আমাদের প্রকৃত ভালবাসার নিদর্শন রূপে তোমার ঐ রক্ত রঙিন-ঠোটে মাত্র একটি চুমুদিতে চাই। আর মোর দেবতা, আমি পরপারে তোমারি জন্য অপেক্ষা করবো। আমার এ আকুল- আশা পূর্ণ খবর পৌঁছাতে কোন সখীর-দাসীদের সহায়তাও পাচ্ছিনা
থে।ে লোহার গরাদে আটা বাতায়নের ফাঁক দিয়ে বাতাসের মারফৎ খবর দিলাম। আর বরষা ভেজা বাতাস-ঠান্ডা হাওয়া! শীঘ্র যেয়ে খবর দিয়ো তাকে।
আমির তার নির্জন কুটিরে জানালার পাশে বসে কি যেন ভাবছিল। সামনে টেবিলের ওপর একগাদা খাতাপত্র ও এক তাড়া চিঠি তার পরান প্রিয়ারা শরীফার চিঠি। শেষ চিঠি আজও এসে পৌঁছায় নি তাকে যাবার জন্য শরীফা আজও কিছুই লেখেনি। বেচারা আমির তাই এক্ষনে পুরোনো চিঠিগুলোই এক একে পড়ছিল। তার মন যেন কাদছিল না জানি আজ শরীফার কি অবস্থা। নেহাৎ মজবুর না হলে সে তার খবর নিশ্চয় পাঠাত। তাই এক অর্নির্বাচণীয় ভাবনায় মগ্ন হয়ে আমীর জানালা পথে আকুল দৃষ্টি মেলে কার যেন প্রতিক্ষা করছিল। হঠাৎ ঝর র্ঝ ফর ফর শব্দে একটা দমকা হাওয়া ঘরে ডুকে টেবিলের ওপর ছাড়ানো কাগজ চিঠি এদিক ওদিক ছড়িয়ে ফেললো। ব্যাস্ততার সঙ্গে আমীর তার প্রিয়ার চিঠিগুলো জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিষ এক একে গুছিয়ে বাক্সো ভরতে লাগরো। বাইরে হাওয়ার জোর ক্রমশই বেড়ে চলেছে। সহসা কড় কড় শব্দে মেঘ ডেকে উঠলো-বিজলী চমকাতে শুরু করলো, শেষে অঝোরে বৃষ্টিও নামলো। আমীরের মনে দারুণ ব্যাথা বাজলো। নিশ্চয় বিজলী, এ বৃষ্টি তার জন্য কোন সুখবর আনেনি। এতদিন যে এতটা কিছুতেই ভয় পেতো না, কিন্তু আজ তার মন যেন আতঙ্কে চমকে উঠলো। সে বাইরের দিকে চেয়ে রইল বৃষ্টি ও বিজলীর দিকে।
সহসা বিজলীর এক চকিত ঝলক ঘরে ঢুকে আমীরের চোখে মুখে ধাঁধা লাগিয়ে দিলো বড় আরশী খানার ওপর সে ঝলক পড়ায় সারা ঘর খানাই যেন সাদা আলোতে ভরে উঠলো। আমীর দু’হাতে চোখ চাপা দিলো। পরক্ষণেই কড় কড় কড়াৎ শব্দে যেন তার কান দুটো ঝালাপালা হয়ে উঠলো। সাথে সাথে হুড়মুড় করে বারান্দার পাশেই বহু কালের পুরোন অশ্বথ গাছটা যেন বার্ধক্যেও তাপ-জ্বালা জুড়াবার জন্য বসুমতীর কোলে শিশুর মতই গা এলিয়ে দিলো। খিড়কীর ফাঁক দিয়ে আমীর সবই দেখতে পেলো। এই গাছটাই ছিল তার উদাসী মনের সাথী, কত অশান্ত-অবসর ক্ষনেই সে তার বিরহী সাথীটার মনে সান্তনা দেবার জন্য শন শন শব্দে গান শুনতো। আজ সে পরিশ্রান্তর মতই মাটীর বুকে আশ্রয় নিলো। দারুণ দুখে ও ক্ষোভে আমীরের মনে ব্যথা বেজে সেও রকম ঝড়-তুফানের সামনা হয়ে পড়েছে কিনা। সে ধনীর দুলালী, এরূপ দুর্যোগ যে মর্মহত হয়ে পড়বে। তাতে বিন্দু মাত্র সন্দেহ নেই। দাসীদের –সখীদের সান্তনা বানীতেই শুধু তারব্যাকুল মন শান্ত হবে তা আমীর ভাল ভাবেই জানতো এবং বুঝতো কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আপনমনেই আমীর বলে চললো মনে হচ্ছে আজকের রাত আমার জন্য হয়তো ভয়ানক দুঃসংবাদ হয়ে এনেছে অথবা অদূর ভবিষ্যতে আমাদের মিলন ঘটিত ব্যপারের সূচনা ব্রত এসেছে। হে অন্তরযামী, হে শোক তাপ নিবাশকারী দয়াময়। তোমার দয়ার উপরই আমাকে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করে তোলো। মানুষ বিজ্ঞান বলে বহু কিছু জয় করেছে করতে পারেনি শুধু মানুষের মনকে জয় করতে। যত প্রকারই চেষ্টা, অর্থব্যয়, শক্তি প্রয়োগ করেছে। কৌশল দেখিয়ে বা ভালবাসা দ্বারা আবদ্ধ করেছে। সকলি ক্ষণস্থায়ী এবং বিফল হয়েছে। হয়তো সময়ের সংকীর্ণতা বা স্বার্থ সিদ্ধির জন্য যে বশ্যতা স্বীকার হয়েছে মুখে অথবা কাগজে কলমে সন্ধিসূত্রে। কিন্তু মনতো কিছুতেই বশ্যতা স্বীকার করেনি। সে স্বঃতই চেষ্টা করেছে ওই বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য। সে সর্বদাই চঞ্চল এবং সচকিত, সুযোগ পেলেই পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়বে সন্দেগ নাই। সে মনও তে তোমার আয়ত্তাধীন, মানুষ মনে মনে যা কল্পনা করে সেটাও তোমার জানা। আবা সেই কল্পনা কার্যে পরিণত করা না করার মূলেও রয়েছে তোমারি ইঙ্গিত। মানুষের কল্পনা প্রেরণা শক্তি সাহস কার্যে প্রয়োগ এবং পরিণতও তুমিই কর।
আমার দরিদ্রই যত সব অনর্থের মূল- রানীতে আমাতে মিলনের ব্যাঘাত ঘটায় ক্ষতি নেই। এই দরিদ্রকে তো আমি তোমারই দানে বলে গ্রহণ করেছি। একে এড়িয়ে আমি স্বর্গসুখকে তুচ্ছ জ্ঞান করি। রানীর নেশাই আমার চেখে ধাঁধা লাগিয়ে আমাকে সর্বহারা করেছিল। তাকে লাভ করবার, তার সাহচার্য সুখানুভবের জন্য আমি এই সুদীর্ঘ তেরো বছর কঠোর সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছিলাম, তোমার ইচ্ছায় তার সুফলও পেয়েছি। সুনাম-সমাজে পরিচিত, অর্থ-বন্ধু বান্ধব সবই পেয়েছি রানীকে তার তুল্য ওজনে সব কিছুই দিবার ক্ষমতাই তুমি আমাকে দিয়েছ সহস্র বার আমি সেজন্য তোমার কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি। কিন্তু জালীম জমানা তবুও কেন তাকে আমার পাশ থেকে ছিনিয়ে নেবার হাতাহতি শুরু করেছে। হে খোদা আমি রানীর অন্তর বেশই জানি। তুমি তাকে সাহায্য কর যে কারো হাতে প্রাণ সম্পূর্ণ করে সুখী হতে পারবে না। তুমিই সে অবলোকে বলে দাও। আর আমার বুকে অদম্য সাহস , বাহুতে অসীম শক্তি অন্তরে তোমার প্রতি ঈমান। তোমাকে ভিন্ন আমি কাউকে পরোয়া করিনে। রানীকে পাশে পাবার জন্য দুনিয়ার কাম্যবস্তু, এতদিনের আয়াস সাধ্য সাধনায় যা পেয়েছি-সবই অকাতরে বিলিয়ে দেবো। এতেও যদি তাদের তৃপ্তি না হয় তবে দেখিয়ে এ রক্ত মাংসে গড়া শরীরের প্রতি অনু-পরমানুতে কি চায় জগৎ চেয়ে দেখবে শরীফা রনী শুধু আমারই। তার ও ক্ষুদ্র হৃদয়ে আর কারও স্থান নেই। অধিকার নেই। আর এখানকার সুখ চির সুখের নয় এসব ঝামেলা ছেড়ে আমরা সেখানে যেয়ে ঘর বাঁধবো, সংসার পাতবোমনের তারে সুর মেলাবো যেখানে এ জালিমদের জুলুম বাজী অচল। হে খোদা আমাদের উভয়েরই যেন এই প্রার্থনা কবুল কর আমিন। বলবার বা ভাববার আর কিছুই আমীর তখন পেলো না। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলো অঝোরে শুধু বৃষ্টি ঝরছে-বিজলীর চমক বা মেঘের গর্জন আর নেই। আর দেরী করা উচিত নয় উপযুক্ত অবসর ভেবে আমীর বর্ষাতীতে গা ডেকে সেই বৃষ্টির মধ্যেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। কি এক অনির্বাচনীয় আনন্দ উৎসাহে তার মুখ উজ্জল চোখে বিজয়ের গর্ব চাহনি। সামান্য বৃষ্টিতে লোক ঘরের বাইরে আসে না আর সে দ্বিধাশুন্য হয়ে গভীর রাতে পথে নেমে পড়লো। কি সে প্রাণের টান। পথে নেমে আমীর কোনদিকেই তাকালো না সর্বাঙ্গ বর্ষাতীতে ডাকা চোখ নাক মুখ ছাড়া সামনে চলাই যেন তার স্বভাব এবং সে যেন তখন একটা কলের পুতুল বিশেষ দম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে দম শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে চলবেই আপাততঃ প্রাণপাত বাধা না পাওয়া পর্যন্ত। অবিরাম চলায় কোনরূপ ক্লান্তিই তার মনে ছাপ দিতে পারলোনা বরং এক অফুরন্ত আনন্দেই যে অনুভব করতে লাগলো। একে গভীর রাত , তার উপর অঝোরে বৃষ্টি পথ জনশুন্য যান বাহণীদের ভাবনা নেই। মোহাবিষ্টের মতই আমীর পথ বেয়ে চললো। ক্রমে বিষ্টি কমতে লাগলো এবং শেষে থেমে গেল। হঠাৎ বর্ষাতির উপর শপ শপ শব্দ না হওয়ায় আমীর এদিক ওদিক চেয়ে দেখলো বৃষ্টি থেমে গেছে ্এবং পূবের আকাশ ক্রমেই পরিষ্কার হয়ে উঠছে। দেখতে দেখতে প্রভাত সূর্যের অরুণ আগ ফুটে উঠলো পাখীর কূজন দূরে শুনতে পেলো। ঘাস ও গাছের পাতার উপর জমা পানিতে সূর্যের কিরণ পড়ে এক মনোহর দৃশ্য আমীর দেখতে পেলো। তার মনে হচ্ছিল যে পানি যেন তার রাণীর অম্যুজল। সারারাত ভরৈ রানী চোখের পানি ফেলেছেএখন যে মুক্ত, তাই প্রভাতের আলোয় সে অশ্র“জল যেন মুক্তা মালার মতই দেখতে। রাস্তার নীচে মুহুর্তে চেয়ে থেকে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে পুনরায় চলা শুরু করলো।
প্রভাতে মৃদুমন্দ ঠান্ডা হাওয়া শির শির করে আমীরের কানে কানে যেন কি সুখবর জানায়ে গেলো। আকুল আশায় সে পথ চলতে লাগলো। দূরে মসজিদের মিনারে সুমধুর আল্লআহ মহান ধ্বনি উঠে মুসলিমের প্রাণে প্রাভাতিক সাড়া জাগায়ে তুলল্ —ধ্বনির শেষে আমীর দুহাত উঠায়ে সেই বিশ্ব পালক জগৎ পিতার উদ্দেশ্যে কিছুক্ষণ ধরে শোকরিয়া আদায় করে, রাস্তার মোড় ফিরে ষ্টেশনের পথ নিলো। তখনও গাড়ী ঘোড়ার আমদানী হয়নি, শুধু দু একখান রিকসা ধীরে ধীরে প্রভাত বায়ূ সেবনের জন্য যেন বেরিয়েছে। স্টেশনের লোকেরা (কর্মচারীরা) চলাফেরা শুরু করেছে। একটা লোক চোখ মুছতে মুছতে ছোট হাত সিড়িটা নিয়ে ল্যাম্পপোস্টের বাতি গুলি সংগ্রহ করছে। আমীর গেট খোলা পেয়ে প্লাট ফরমে ডুকে পড়লো। একটা নিরিবিলি জায়গা দেখে বসে পড়লো। তার চেখের উপর ভেসে উঠতে লাগলো। রাতের সেই অতীত কাহিনী ও ছবিগুলি। সে বসে বসে আগাগোড়া সব গুলি মনে করতে লাগলো। কিভাবে সে ষ্টেশনে এসে পৌঁছলো এবং এর পর কোন দিকে কোথায় যাবে তার গন্তব্য স্থল। এমন সময় দরজার পাশে জনৈক কর্মচারী হাকলো ‘ফোর ডাউন’ । ত্রস্তে তার কুন্ডলিকৃত ছেড়া ময়লা কম্বল খানা সরিয়ে একটা আধ বয়সী লোক চোখ রগড়াতে রগড়াতে এসে বারান্দায় ঝুলানো লোহার টুকরার উপর একটা ডান্ডা দিয়ে ঢং ঢং ঢং করে তিনটি ঘা মেরে তার উপরে আরও ছোট ছোট অনেক গুলি ফাউ দিয়ে কল তলায় গিয়ে হাজির হলো। আমীরও তন্দ্রা জড়িত চোখে সেখানে গিয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করলো কোন গাড়ী আসছে এবং কত দেরী। উত্তরে লোকটি বললো কলকাতার গাড়ী তেছরা স্টেশনে ছিলো এক ঘন্টার মধ্যে এখানে পৌছাবে। হাত মুখ ধুয়ে সে স্টেশনের স্টলের দিকে এসে দেখলো ইতিমধ্যে সেখানে বিশ/ত্রিশ জন যাত্রী ভোরের আরষ্টতা দুর করছে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে। সেও কিছু খাবার ও চা দিয়ে তার শরীরটা একটু চাঙ্গা করে তুলে অন্যান্য যাত্রীর সঙ্গে টিকিট কিনলো, একেবারে শিয়ালদহ স্টেশনের। সেখানে অবশ্য তার কেউ নেই-নেই তবু সে জানে শিয়ালদহ ই এই গাড়ীর শেষ গন্তব্যস্থান। তাই সে গাড়ীর সঙ্গী হিসেবে টিকিট কিনলো। হযতো তারও বাঞ্ছিত বস্তু সেখানে মিলতে পারে। সে জানতো তার রানী কলকাতা থেকে প্রায় দিনেকের পথে তার বাবার বাড়ীতে থাকে। তবুও তার মনের কোনে কে যেন বলে গেলো কলকাতায় লোকে লোকারণ্য কত দেশ বিদেশের লোক সেখানে নিয়তই যাতায়ত করে। এই যাতায়তের মধ্য দিয়েই হয়তো বা এক দিনে সেই লোকারন্য কলকাতার বুকেই তার বুকের মানিক আশার আলো সাধনার শরীফা রানীর দেখা পাবে। তাই সে কিছুটা আশ্বস্থ হয়ে অদূরে কালো ধূয়া ছেড়ে আগত প্রায় গাড়ীর দিকে তাকাল। যেন এক বিরাট কাল দৈত্য মাটী কাঁপাতে কাঁপাতে ছুটে আসছে তাদের দিকে। মুহুর্তের মধ্যেই গাড়ীখানা প্লাট ফরমে ঢুকে পড়লো আমীর সন্দেহহীন হয়ে একটা দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরায় উঠে বেঞ্চের ওপর গা এলিয়ে দিলো। দেখতে দেখতে যাত্রী উঠা নামা শেষ হলো, গার্ডের বাঁশী নিশানের ইঙ্গিতে কান ঝাঁঝানো মিহিসুরে চেছিঁয়ে হুস হুস শব্দে গাড়ী আবার ছুটে চললো।
সহৃদয় পাঠক-পাঠিকা হয়তো আমীরের এক ঘেয়ে কাহিনী শুনতে শুনতে ধৈর্যহীন হয়ে পড়েছেন। কিন্তু উপায় কি? বেচারা আমীরের মত অবস্থায় পড়লে খুব কম লোকই এতটুকু ধৈর্যশীল হতো তাতে সন্দেহ নেই। কোন পাঠিকা হয়তো ভাবতে পারেন শুধু আমীরের কথাই চলছে বেচারা শরীফার কোন খোঁজ এপর্যন্ত নেওয়া হলনা। এটা নেহাৎ এক চোখামী। তাই আসুন সবারই মনের গোপন ইচ্ছাটুকু মিটাবার একটু চেষ্টা করা যাক। সেই লোহার গরাদে আঁটা খিড়কীর ফাঁক দিয়ে বাতাসের মারফৎ খবর পাঠাবার পর আর আমরা রানীর কোন খোঁজ নিতে পারিনি। এইবারে দেখি পর্দায়র পিছনে কতধদুর কি ঘটলো।
বর্ষা-ভেজা বাতাসের মারফৎ খবর পেয়েই রাণী চুপ ছিলনা। সে জানালার পাশে মাথা রেখে কায়মনে সেই অনন্ত দয়াময়ের কাছে চিরমুক্তির জন্র প্রিয়-মিলন হেতু এবং তার সাহায্য পাবার জন্য আকুল হয়ে। মোনাজাতের জন্য দু‘হাত উঠায়ে কি বলছে ধৈর্য ধরে শুনুন। হে রহমানুর রহিম খোদা, আলেমুল গায়েব। তুমি সারা জাহানের মালিক, সবচেয়ে বড় দাতা এবং দয়ালূ, তোমার রাজ্যে কোন কিছুরই অভাব নেই। তুমি সবার আদী এবং সর্বজ্ঞ মানুষ যা কোনদিন ভাবেনি ভাবতে পারে না। তাও তৈামার অগোচরে নয়। তোমার অতুল ঐশ্বর্যরাশি যদি অকাতরে বিলিয়ে দাও বাধা দেবার মত কেউ নেই, অথবা সে ধন ভান্ডার নিঃশেষ হবার নয়। তুমি সদা মঙ্গলম, মানুষের ভূল-সংশোধনকারী পথ ভুলে, জেনে অথবা না গেলে যদি কেউ তোমার অমনোনীত পথে চলে তবুও তুমি তাকে সুপথে এনে থাকো। যাতে তোমার কীর্তিমালা তোমার দয়া কর্তব্যজ্ঞান কিছুরই তুলনা হয়না। কারো প্রতিই তোমার বিন্দুমাত্র ঈর্ষা বা কার্পণ্য নেই। বিপদ সে তোমার তোমারই দান। এই সামান্য বিপদে যদিও তিন দিন উপবাসী, তোমার দয়ায় যতক্ষণ শ্বাস বইবে, শুধু তোমারই রহমতের উপরে ভরসা করে থাকতে বিন্দু মাত্র বিচলিত হবনা। তুমিই এ জীবন দিয়েছ এতদিন দুনিয়ার গুলবাগে আরামে চলতে ফিরতে দিয়েছ। আজ আবার তোমার ইচ্ছায় বন্দিনী। যারা আপত্যøেহে আমার সামান্য মাথা ধরলে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়তো আজ তারাই সামাজিক রীতির দায়ে আমাকে এবেশে রেখেছেন। সেজন্য আমার কিছু মাত্র আফসোস নেই। আমার সে পরম আরাধ্য গুরুজন পিতামাতার প্রতি কোনরূপ অভিযোগও নেই। তুমি তাহাদিগকে ক্ষমা করো। হে ক্ষমার মালিক। তাদের প্রতি রুষ্ট হয়োনা, তারা মজবুর, তাদের বুকেও হযতো প্রবল ধাক্কা লাগছে-সামলে নিতে ক্ষমতা দাও তাদের। হে গফুরুর রহিম, আজিজুল হাকিম। আমি তোমার অনুগ্রহে জীবনভর কৃতজ্ঞ অকৃতজ্ঞতার পাপ থেকে আমাকে রক্ষা করো। তোমার কাছে চাইবার কিছুই নেই যা দিয়েছো পেয়েছি, তÍই শোকরিয়া আদায় করবার শক্তি দাও। বিপদে মানুষ ধৈর্যহারা হয়ে ক্ষুধা পিপাসায় কাতর হয়ে জীবনে ধীক্কার দেয় তেমাকে নিষ্ঠুর ভাবে হে মঙ্গলময়, হে চির সুন্দর আমাকে যে ঐরূপ ভ্রন্ত ধারণার বশবর্তী হতে না হয়। আমাকে হযরত ইব্রাহিমের (আঃ) মত সাহস, হযরত ইউনুস (আঃ) মত আশা, হযরত আছিয়া(আঃ) এর মত ধৈর্য, খোদেজাতুলকুবরার মত একনিষ্ঠতা এবং সেই কারবালা প্রান্তরে হযরত এমাম হোছেন(রাঃ) শোক বিধুরা বিবী উম্মেকুলসুম ও শাহরে বানুর মত দ্বিধা শুন্য হৃদয় দাও। সে তপ্ত মরুতে সদ্যপ্রস্ফুটিত রক্ত জবা বিবী ছখিনার মত ধীর স্থির করে তোলো। আমার অন্তিম প্রার্থনা কাশেমের পদপ্রন্তে চিরনিদ্রায় মগ্ন ছখিনার মতো আমীরের পাশেই যেন আমার শেষ নিঃশ্বাসটুকু ফুরিয়ে যায়।আর কিছুই চাই না তাকে এ জালেম দুনিয়ার ছায়ায় না পেলেও যেন পর পারে তার সান্নিধ্য পাই আমিন।’
ধৈর্যশীল পাঠক পাঠিকাগণ। একবার ভেবে দেখুন কি করুণ্ নিষ্কলুষ পবিত্র প্রেম মাখা মোনাজাত। ধনীর দুলালী, আকৈশোর সুখের সাগরে যে সাঁতার কেটেছে রাজসংসীর মতো এই ঘোর দুর্দিনে বন্দিনীর বেশে উপবসী অবস্থায় তার মুখে কি সুমধুর সুর। আর মুখেই বা তার কি স্বর্গীয় শোভা। ধন্য রানী তুমিই ধন্য। অনন্ত পিয়াসে ছাতি ফেটে যায় তবুও মুখে পানি পাবার আকুলতা প্রকাশ করে না। যার জন্য তার আজ এই বেশ তাকে না পেয়ে কারো কাছেই এটুকু অভিযোগ নেই। সাধে কি বেচারা আমীর চেয়েছিল তার যথাসর্বস্বের বিনিময়েও তোমার সাহায্য।
এমনি তন্ময় হয়ে রানী মোনাজাত করছিল যে, বাইরে এতক্ষণ কি হচ্ছিল তার কিছুই সে টের পায়নি। জানালার পাশেই সে ছিলো কিন্তু তার চোখ মুহূর্তের জন্যও বাইরে কিছু দেখতে পায়নি। সে যেন চর্ম চক্ষুহীন হয়েই মানুষ নয়নে সবই অতি নিকটে দেখছিল। তার বন্ধীখানায় একটা সবুজ কাঁচ বিশিষ্ট বিজলী বাতি জ্বলছিল। হঠাৎ এক সময় (মোনাজাতের পর)তখনও তার তন্ময়তা কাটেনি ভাল করে। তার ছোট কামরা খানি যেন এক উজ্জল আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। চোখ খুলতেই দেখতে পেলো সে শুভ্র আলোক ধীরে ধীরে তার মাথার পাশ দিয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল গুরুজনের মত আষীষ জানিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে রানী যেন চিন্তা না করে। নির্বাক বিস্ময়ে সে বাইরের দিকে চাইতে কড় কড় শব্দে মেঘেরে গর্জন শুনতে পেলো-মুহূর্তে বিজলীর তীব্র ঝলক এসে যেন তার চোখ-মুখ ঝলসে দিল। ভয়ে সে দুহাতে চোখ চাপা দিয়ে লা-হাওলা পড়তে লাগলো। বিজলীর তীব্রতা কেটে যাবার সাথে সাথে চোখ খুলে সে দেখলো বাইরের ঘরের ভিতরে আগুনের হলকা ছুটেছে। সারা ঘর খানি যেন আগুনের পাহাড় এবং চারিদিক হৈ চৈ শুরু হয়ে গিয়েছে। দেখতে দেখতে সে আগুন বড় ঘরের (হলের) দরজা জানলা দিয়ে ঢুকে সারা বাড়ীতে ছিটিয়ে পড়লো। যার যার প্রাণ নিয়ে সরে পড়তে লাগলো। কেউ কারো দিকে ফিরে চাইবার অবসর পেলোনা। শুধু সেই বসে রইলো নির্বিকার হয়ে-যেন কতকালের তপস্যায় মশগুল। সে ভাবছিল হযতো খোদা একান্ত দয়াপরবশ হয়েই তার আকুল প্রার্থনা শুনেছেন এবং চির –মুক্তির পথও করে দিয়েছেন-ঐ আগুনের বুকের ভিতর দিয়ে। তাই সে সেই শুভ-মুহুর্তটীর অপেক্ষা করতে লাগলো- কতক্ষণে সে মুক্তি পাবে- এবং তার শেষ প্রার্থনার রেশ ছিল ছখিনার মতো কাশিমের পদপ্রান্তে শেষ নিশ্বাস ফেলবার। সময় অবশ্য এসেছে তবে তার তিম আমীর এখনও আসেনি-রানী যেন একান্ত ভাবে তারই প্রতীক্ষা করতে লাগলো।
খোদার লীলা বুঝা দায়। আমীর সত্যই এলো না, কিন্তু ব্যাপারটা ঘটে গেল অন্যরূপ। উপরের হল ঘরের সিড়ি এবং ছাদের বীম-বরগা একযোগে তুমুল শব্দে ভেঙ্গে পড়লো রানীর কামরার ওপর। একে ছোট কামরা-তার ওপর আগুন সহঅতটা ভারী সইতে না পেরে সে কামরাটিও ভেঙ্গে পড়ল। চকিতে রানী এক পাশে সরে পড়ল। কিন্তু ছোট কামরাটি আগুনের কুন্ড হয়ে গেল। তার মা-বাবা অবশ্য সামান্য আহত হয়েই নি®কৃতি পেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের মনে শুধু রানীর চিন্তা উঠছিল। একে একে পিছনে ফেলে আশা দিনগুলির কথা তাদের বুকে দারুণ শেলের মতই বিধছিল। রানীর বাবা অস্ফুট স্বরে এক সময় বলে ফেললো হয়তো বা রানীর মনের ওপর অমানুষিক অত্যাচারের ফলেই আজ তাদের এ সর্বনাশ এবং যাকে কেন্দ্র করে এ ব্যপার সংঘটিত হলো-লোহার –গরাদে আঁটা সে কামরা খানা তাকে আর বন্ধী করে অক্ষত দেহে রাখতে পারলো না। এতক্ষণে ঐঅগ্নিকুন্ডে সে হয়তো জীবন্ত সমাধী পেলো। হায়ওে নসীব! কে জানতো এমনটি ঘটবে? আগে জানলে আর তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছুই করতাম না।তবে বুড়ো মুনশী সাহেব কে কোনমতে বুঝিয়ে সম্বন্ধটা উঠিয়ে নিতাম হয়তো কিছু অর্থ ব্যয় হতো, রানী আমার বেচেঁ থাকতো। সেই আমার সাত রাজার ধন! তারা বলেছিল-রানী তাদের ভাবী –পুত্র বধু- যেরূপে অৎস্র অর্থব্যয়ও তাকে তারা ছাড়বে না। কিন্তু কই, তারা তো সবাই ছুটে এসেছে-চেয়ে আছে ঐ ঘরখানির দিকে-কেউই তো পারলো না আমার রানীকে বের করে আনতে-আগুনের হাত থেকে। আমার কি মনে হচ্ছে জানো সেলিনা? এনে হচ্ছে আমীর আজ পাশে থাকলে নিশ্চয়ই ওদের মত শুধু হাঁ করে চেয়ে থাকতো না। হয় সে রানীকে উদ্ধার করে আনতো-নইলে সেও রানীর সাথেই জীবন্ত পুড়ে মরতো ঐ আগুনে। উহ্, কি ভুল করেছি! আমার এ অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত হয় না। পিতা হয়ে সন্তানের আদরের দুলালী, নয়নের তারা øেহের রানীকে আজ জীবন্ত পুড়িয়ে মারলাম। খোদা! আমাকেও ওর সাথী করে দাওÑ যেন ভোরে কেউ আমাকে কন্যা-হন্তা বলতে না পারে। খান বাহাদুর সাহেব, কন্যা শোকে এমনি কাতর হয়ে পড়েছিলেন যেন কেউই তাঁকে প্রবোধ দিতে সাহস করছিল না। তাঁর করুণ বিলাপে শোক বিধুরা মায়ের øেহে উদ্বেল হয়ে সেলিনা আর ধৈর্য ধারণ করতে পারলেন না। তিনি শোকে রাগে বলে উঠলেন – দাও না গিয়ে এবার মেয়ের বিয়েটা ওই বিলেত ফেরতা ধনীর দুলালের সাথে। আগেই বলেছিলাম – রানী আমার যেখানে সুখী হয় সেখানে বিয়ে দিতে হবে। তোমার সম্মান-আভিজাত্য-খানবাহাদুরী উপাধীতে দাগ লাগবে বলেই তো মা আমার জীবন্ত পুড়ায়ে, তার খুনে রাঙা আগুনে তোমার সে আশঙ্কার কালিমা কালাই করে নিলে। এখন আর ভয় কিসে? বেশ আরামে দিন কাটাতে পারবে। এইরকম শোক তাদের মাঝ দিয়েই রাতের আঁধার দূরে সরে গেলো- প্রভাতের মৃদুমন্দ বায়ূ যেন এই শোক-সন্তপ্ত পরিবারে শান্তিও পরশ দেবার জন্য ছুটোছুটি শুরু করে দিলো। প্রভাত সূর্যের অমিয় কিরণে জগৎ হেসে উঠলো-যেমনি প্রতিদিন ওঠে। গত প্রভাতে এই খানবাহাদুর সাহেবের কুটির ছিল কত সৌজন্য সৌন্দর্য এবং মন –আকর্ষণের উপকরণে ভর্তি, আর আজ সেখানে পোড়া আধপোড়া ছাই ও ইট-পাথরের ধ্বংসস্তুপ যেন তাদের বিগত আভিজাত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে! সবাই মিলে বন্দিনী রাণীর কক্ষে ঢুকলো তার শেষ চিহ্নটুকু দেখবার জন্য কিন্তু সেখানে দেখবার মত যা ছিল- তা শুধু পোড়া কাঠ কয়লা ইট চুনাবালু ইত্যাদি, রানীর কোন চিহ্নই সেখানে ছিল না। সবাই ধারণা করলো রানী এই ধ্বংস স্তুপের মাঝেই সমাধী পেয়েছে।
মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত সত্য ও ন্যায়ের পথে চলে তার ধৈর্য্য সাহস ও আত্মনির্ভরতা ততই বেড়ে ওঠে। আবার অতি সামান্য কারণে পথভ্রষ্ট হলেই তাকে এমনি মুষড়ে পড়তে হয় যে আগের সে ধৈর্য্যরে বাঁধ শিথিল হয়ে পড়ে-আত্মনির্ভরতা তখন আর থাকে না। খানবাহাদুরের অবস্থাও তদ্রুপ। খোদা যে অসীম দয়ালু তাঁর ইচ্ছার উপরই পৃথিবীর সব কিছুই নির্ভর করে একথা আর খানবাহাদুরের অভিশপ্ত প্রাণে তৃপ্তি জোগাতে পারছিল না। কথায় বলে জীবদাতার শক্তি জীবন সংহারকের চেয়ে বেশী। কিন্তু আকস্মিক বিপদে আজ তাদের কাছে এটা যেন শুধু উপকথাই। রাতের অন্ধকার-সেই অগ্নি-অভিনয়ের পর্দার পিছনে যে কি এক অভাবিতপূর্ব অঙ্কন শেষ হয়েছে তা কেউই জানে না। ধৈর্য্যশীল পাঠক পাঠিকারা বাহুর পাশে সে দৃশ্যের শেষ অঙ্কন দেখতে পাবেন।
জনৈকা –ভদ্র মহিলা ভোরে ট্রেনে কলকাতা যাবার জন্য টাঙ্গায় করে গ্রাম থেকে স্টেশনে আসছিলেন। তখনও প্রভাত সূর্যের কিরণছটা আকাশের বুকে ফুঠে ওঠেনি। মহিলা একা সঙ্গে মাত্র একটা ছোট ব্যাগ মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী। কিছুদূর আসার পর রাস্তার মোড়ে একটা বান্ডিলাকার কোন কিছু পড়ে আছে আবছা দেখতে পেলো। মহিলাটির দৃষ্টিশক্তি বড়ই প্রখর, তাছাড়া শৈশব থেকই খুাঁটিনাটির ভারী নর্জ হঠাৎ টাঙ্গাওয়ালাকে থামতে বলে নিজেই গাড়ী থেকে নেমে রাস্তার পাশে সেই আবছা বান্ডিলটার কাছে গেলো। গাড়োয়ানও টাঙ্গা হাঁকিয়ে পাশে নেমে পড়লো। সেই বান্ডিলের Oপরকার কাপড়খানা সরাতেই মহিলাটি চমকে উঠলো আসলে সেট ছিল একটা মৃতপ্রায় যুবতী। ভালভাবে নাড়ী দেখে সে বুঝলো যুবতী এখনও জীবিতা। তাই সে গাড়োয়ানকে পানি আনতে পাঠায়ে যুবতীকে ভালভাবে পরীক্ষা করতে লাগলো। যুবতীর সর্বাঙ্গে কালির ছাপ, হাত পায়ে ফোসকা উঠছে, মুখের উপর কালির ছাপ। হঠাৎ মহিলাটি যেন শিউরে উঠলো এ যে তারি বাল্য সখি রানী! বহুদিন যাবৎ স্কুল ছাড়ার পর আর তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়নি, তবুও সে ভোলেনি সইয়ের মধুমাখা মুখছবি! তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলে সে একটা ওষুধ বের করলো, পানি নিয়ে টাঙ্গাওয়ালা ফিরে এলো। রানীর চোখে মুখে পানির ছিটা দিতেই যেন সে সংজ্ঞা ফিরে পেলো। চোখ তুলে সে চাইলো মহিলাটির দিকে কিন্তু চিনতে না পেরে পুনরায় চোখ বন্ধ করলো। মহিলাটি রানীর নাম ধরে ধীরে ধীরে ডেকে ওষুধ সেবন করালো। অল্প সময়ের মধ্যেই সে উঠে বসলো। মহিলাটি তখন রানীকে টাঙ্গায় চাপিয়ে টাঙ্গাওয়ালাকে জোরে খুব জোরে হাঁকাতে বললো। ট্রেন ধরিয়ে দিলে তাকে দু’টাকা বখশিশ দিবে বলায় টাঙ্গাওয়ালা তীরবেগে ঘোড়া ছুটালো। ভাড়া দিয়ে টাঙ্গাওয়ালাকে বিদায় করে, রানীকে সঙ্গে নিয়ে শীলা স্টেশনের ওয়েটিং রুমে ঢুকে পড়লো বেয়ারাকে কিছু খাবার ও টিকিট আনতে বলে সে রানীকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ধুয়ে মুছে কাপড় বদলী করায়ে আনলো। খাবার খেয়ে রানী একটু সুস্থ হলো এবং মহিলাটির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে ‘শীলা’ বলে দুহাতে তাকে জড়ায়ে ধরলো।
শীলার আতঙ্ক কেটে গেল। আপাততঃ তাকে কলকাতা পর্যন্ত পৌছান দুষ্কর হবে না-দুচার দিন হাসপাতালে থাকলেই সে পূর্ণ স্বাস্থ্য ফিরে পাবে। গাড়ী এসে পড়ায় তারা গিয়ে উঠলো একটা দ্বিতীয় শ্রেণীর মহিলা কম্পার্টমেন্টে। সেখানে আর কেউ না থাকায় শীলা সযতনে রানীকে শোয়ায়ে ওষুধ দিয়ে, তার ফোস্কা দূরীকরণের চেষ্টা করতে লাগলো। শীলার পুরানো সখীর হাতের পরশে রানী যেন আশ্বস্ত হলো এবং শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়লো। মাঝে একবার নৈহাটী স্টেশনে রানী জেগে উঠেছিল। শীলা তাকে কিছু তাজা খাবার কিনে খাওয়ালো। তার করুণ মিনতিতে রানী পুনরায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লো সপ্তাহব্যাপী অনাহার অনিদ্রাক্লিষ্ট শরীর শীঘ্যই নিদ্রদেবীর কোলে গা ঢেলে দিল। প্রায় দশটার সময় গাড়ী এসে ঢুকলো-শিয়ালদহ স্টেশনে। শীলা রানীকে জড়িয়ে ধরে গাড়ী থেকে নামলো। প্লাটফরমের বাইরে এসে একটা গাড়ী করে তারা লম্বা ছুট দিলো মেডিকেল কলেজের দিকে। কিছুক্ষণ পরেই শীলাদের গাড়ী গেটে পৌছলে বড় ডাক্তারের সাথে দেখা হলো। শীলা তার রানীর অবস্থা জানালে ডাক্তার তৎক্ষণাৎ রানীকে নিয়ে একটা সুন্দর কামরায় জায়গা করে দিলো। নার্স নিযুক্ত হলো রানীর সেবার জন্য। কামরাটি বাইরের আলো-বাতাসের অবাধ প্রবেশ পথে সামনে করিডোরের ওপারে কামরা দ্বিতীয় শ্রেণীর পুরুষদের জন্য। সেখানে তখন কোন রুগী ছিলনা। শীলাও রানীর পিছনের কামরাতে উঠে এলো আপাতত যতদিন না রানী সুস্থ হয়। বিকেলের দিকে রানী বেশ স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেল। বরং সে যেন পুনরজীবন লাভ করেছে। তার পূর্ব জন্মেও প্রভাত থেকে পূবাহ্ন পর্যন্ত যেমন সুখের ছিল, এখনও যেন তার জের চলছে। নার্সদের প্রাণপণ সেবা ও শীলার দরদভরা আদরে সে তার বিগত বন্দীজিবনের কথা একরূপ ভুলেই গেল। তার মন যেন একেবারে সজীব ও সতেজ হয়ে হেসে খেলে উঠলো। শীলা মনে মনে দয়াময়ের দয়ার অশেষ কৃতজ্ঞতাস্বীকার করে প্রার্থনা জানালো-প্রভু! নিভে যাওয়ার হাত থেকে যখন এ দীপশিখা পুনরায় জ্বালায়ে দিয়েছো, তখন উপযুক্ত তেলও জোগায়ে দাও যেন আজীবন এ দীপ আলোদান করতে পারে।
চীরদুঃখী আমীরের দরদী পাঠক-পাঠিকারা একবার পর্দার পিছনে বাহুর পাশে ফিরে চাইবেন কি? তাকে গাড়ীতে রওনা করে দেবার পর আর কোন খবর নেই। দেখা যাক সে কলকাতায় পৌঁছলো কিনা অথবা কোথায় সে আশ্রয় পেলো। একটু এগিয়ে চলুন- দেখবেন সে দুঃখীর পূজারী বেশী দূর যেতে পারেনি। পথের মাঝেই তার দুখের মাত্রা শেষ বারের মত বেড়ে উঠলো। শীলার সাথে রানী যখন তাদের কামরার পিছনে সান্ধ্য সমীরণের মৃদু পরশে মেতে সুখের কল্পনা করছিল। তখন এখানা এম্বুলেন্স গাড়ী এসে পৌঁছলো-দ্বীতিয় ম্যেণীর পুরুষদের রুমের সামনে চারজন যুবক-ছাত্র। তিনজন সহকারী ও দুটো নার্সকে সঙ্গে করে বড় ডাক্তার এসে গাড়ী থেকে একজন রোগীকে নামায়ে উক্ত রুমে নিয়ে গেলেন। রোগীর অবস্থা তখন খুব শোচণীয় জ্বর ১০৪, মুর্ছা যাচ্ছে এবং ক্ষণিক পরেই হয়তো বা প্রলাপ বকছে। সন্ধ্যা উৎরে যাবার পরই প্রলাপ বকা বেড়ে চললো-রোগী লাফিয়ে উঠতে চায় রানী রানী করে হাত বাড়ায়ে দেয়। বড় ডাক্তার রোগীকে শান্ত করবার জন্য, ঘুমুতে দেবার জন্য মর্ফিয়া দিলেন। দুজন নার্সকে শীলার সখির সেবায় রেখে তাকে শীঘ্রই ডেকে পাঠালেন। ব্যস্ত সমস্ত হয়ে শীলা বড় ডাক্তারের পাশে এসে দাঁড়াতেই রোগীর দিকে তার নজর পড়লো। শীলা যেন প্রথমে ভয়ে আৎকে উঠলো-পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণে চাপা হাসির রেখা ফুটে উঠলো। ছাত্র ডাক্তারেরা রেগীর দিকেই চেয়ে ছিল, কিন্তু বড় ডাক্তারের চোখে যেন শীলার এই অভাবনীয় আতঙ্ক ও হাসী একযোগে একটা বিস্ময়ের সৃষ্টি করলো। ডাক্তারের চোখে চোখ পড়তেই শীলা ইঙ্গিতে জানালো-তাকে ডাকা হয়েছে কিনা? ডাক্তার সংযত আধো স্বরে এবং ইঙ্গিতে যা জানালো তার অর্থ-এই রোগীর পরিচর্যার জন্যই তার সহায়তা অত্যাবশ্যক। শীলা ডাক্তারের মনোভাব বুঝতে পেরে রোগীর শিয়রে ছোট টেবিলের ওপর থেকে চার্টখানা তুলে নিলো। সে একদৃষ্টে মিনিট দুয়েক রোগীর দিকে চেয়ে রইলো। হঠাৎ অস্ফুট কাতরানি ভেসে এলো রাণী! শীলা সেই চার্টের ওপর অবস্থানুসারে ওষুধ পথ্যের পরিবর্তন করে নার্সের হাতে দিল এবং ইঙ্গিতে বড় ডাক্তাকে বাইরে ডাকলো। করিডোওে ফিরে এসে শীলা ডাক্তারকে বললো রোগীর যে অবস্থা, যতœ এবং সতর্কতা প্রয়োজন, হার্টফেল করবার সম্বাবনা এতে বেশী। ডাক্তারের মনেও ঐ কথাটাই তোলপাড় হচ্ছিল। তাই ডাক্তারের একান্ত অনুরোধে শীলাকেই রাতে রোগীর পরিচর্য়ার ভার নিতে হলো। সচতুরা শীলা ডাক্তারকে কিছুটা খুলে কিছুটা গোপন করে বললো দরকার হলেতাকেও রাতে আসতে হবে একা, আর তার সহকারিনী হিসেবে শুধু এই নার্সটাই যথেষ্ট। বেশী লোকের আনাগোনা কুফলও দিতে পারে।
পূর্বেই বলা হয়েছে শীলা রানীর বাল্য সখী! সে রানীকে সে রানীকে ছোট বোনের মতই ভালবাসতো। রানীও তাকে ঠিক তেমনি ভাবে তার প্রতিদান দিতো। রানীর ভালবাসা যে শুধু আমীরের প্রতি একথাও শীলা জানতো। আর আমীর তো তারই দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়তা সূত্রে ভাই। কাজে কথায় এবং প্রাণে একই মাধূর্য ছিল বলে শীলা আমীরকেও রড় ভাল জানতো এবং রানীর সঙ্গে তার বিয়ে দেবার পক্ষপাতিনী ছিল। কিন্তু সাহস করে সে রানীর মা-বাবাকে কিছু বলতে পারেনি কারণ পাত্র এবং তার হিতাকাঙ্খিনী উভয়েই গরীব-সমাজে তাদের খুব কমই আধিপত্য। তাই সে রানীর প্রতি দিন দিন তার মা-বাবার সন্দিহান, অবিচার-অত্যাচার সইতে না পেরে ওদের সঙ্গে মেলা মেশা একরূপ বন্ধ করে দিয়েছিল মাঝে মাঝে রানীর সাথে চিঠিপত্র আদান প্রদান ছাড়া। হঠাৎ রানীর মা-বাবা। আমীরকে এরূপ বিষকৃশ, হেয় জেনেÑরানীর অমতে অন্যত্র বিয়ে দিতে কৃত সংকল্প হয়েছেন শীলা তা’ জানেনা। রানীও তাকে জানায়নি। অপ্রত্যসিত ভাবে রানীকে রাস্তায় পাওয়া মৃতপ্রায় অবস্থা থেকে বেঁচে ওঠা, আনন্দে পুনরায় দুলে ওঠা যেন শীলার মনে সেই যাদুকরের খেলা বলেই বিশ্বাস হলো। তা’ছাড়া – তেমনি আকস্মিক ভাবে পাশের রুমেÑ বাহুর পাশে সেই মোহন ছবি, সত্য পেমিক রূপে যে ছিল এতদিন রানীর মনো জগতে শুধু একটা স্বপ্ন, মনের আকাশে উজ্জল ধ্র“বতারা রূপে। কি অদ্ভুত অপরূপ খেলা এই বিশ্ব-বাজীকরের!
হঠাৎ শীলার চিন্তায় বাধা পড়লো, পাশের রুম থেকে রানীর সেবায় –নিযুক্তা নার্স এসে বললো- সে বিছানার পাশেই বসে ছিল, রানী হঠাৎ আমি- আমি- করে চেছিঁয়ে উঠে। শুতে বলায় সে ছুটে এসে নার্সের পায়ে হাত দিতে দিতে বলে শীলা দি! আমীর এসেছে তার জন্য সবাই বসে আছি কেন এলোনা? তার কাছে নিয়ে চলো। নার্সের কথায় শীলা ব্যাপারটা বুঝলো তারই প্রেমিক বটে, বাহুর পাশে থেকে কি প্রেমিকা তার প্রেমিক কে ভুলতে পারে? নিশ্চয় না! এমন সময় রোগীটাও যেন একটু গা ঝাড়া দিয়ে পুনরায় রানী, আমার রানী, শরীফা রানী, আমি এসেছি এই যে হাত ধরো বলে হাত বাড়াতেই হাত শীলার কাধের ওপর এসে পড়লো। শীলা এক মূহুর্ত চিন্তা করে নার্সকে টেলিফোনে বড় ডাক্তারকে এখনই রুমে আসতে বললো। নার্স টেলিফোন রেখে রোগীর পাশে এসেই অবাক হয়ে চেয়ে রইলো। রোগী শীলাকে এমনি ভাবে জড়িয়ে ধ’রেছে যে কিছুতে ছুটবার যো নেই, আর সে বার বার রানী রানী করছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বড় ডাক্তার এসে পৌঁছলেন। রোগীর তখনকার দৃশ্য দেখে ডাক্তারের চক্ষু স্থিরÑ হঠাৎ বিকার চেপে গেল না সে ভন্ডামী শুরু করেছে-ভাল বুঝতে পারলো না। শীলা তখন সব কথাই ডাক্তাকে শুনাতে লাগলো। কথা শেষ হবার আগেই দ্বিতীয় নার্স রানীর কামরা থেকে ছুটে এলো তাকে ধরে রাখা যায়না শুধু আসছি-যাচ্ছির চোট। ডাক্তার ও শীলা কিছুক্ষণ ধীরভাবে চিন্তা করে শেষে সাব্যস্ত করলোÑ তাদের মিলন অত্যাবশ্যক- অন্যথায় সমূহ ক্ষতির কারণ আছে। রানী বেশী শীলা তখন খুব আস্তে ঈষৎ ঝাঁকানি দিয়ে রোগীকে বললো – আমীর চেয়ে দেখো, আমি রানী নই শীলা! রানী অন্য কামরায় আছে। তুমি যদি ধৈর্য হারা না হও- তবে তার সঙ্গে দেখা করাতে পারি। শীলা নাম শুনে রোগী আমীর কান খাড়া করে চোখ মেলে দেখলো-সত্যই সে শীলা। তখন রোগী রানীকে দেখতে চাইলো। শীলার ইঙ্গিতে নার্স রানীকে আমীরের কাছে যাবার কথা বলায় রানী নার্সকে এমনি করে বুকে চেপে ধরে তার সুখ চুম্বন করলো যে সে কিছুই বলতে বা ভাবতে অবসর পেলো না। মিনিট খানেক পরে রানী নার্সকে করুণ-মিনতি জানায়ে তাকে তার প্রিতম , জীবনের সর্বোত্তম, নব-জীবনের আশা-আলো আমীরের পাশে নিয়ে যেতে পুনঃ পুনঃ অনুরোধ জানালো। নার্স তাকে হাত ধরে করিডোর পেরিয়ে সোজা সেই সান্ধ্যকালীন রোগী আর মধ্যরাতের প্রেমিক আমীরের কাছে পৌঁছায়ে দিল। আমীর ব্যাগ্রতার আতিশয্যে বিছানায় উঠে বসেছে। হঠাৎ নার্সের সাথে রানীকে দেখে সে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে যেয়ে রানীকে বাহুর পাশে আবদ্ধ করলো। সে দৃশ্য চেখে না দেখলে বুঝা যায়না কতকালের অনন্ত পিয়াসা নিয়ে তারা পরস্পরের পানে ছুটে এসেছে কে জানে! বুঝিবা তা হজরত আদম (আঃ) এবং বিবী হাওয়ার স্বর্গ থেকে দুনিয়াতে বিক্ষিপ্ত হয়ে চল্ল্শি বছর বাদে আরাফাতের ময়দানে পুর্নর মিলনের সুখময় উচ্ছাস ভরা, বিবী হাজেরার মরু প্রান্তরে ইব্রাহিমের পূণ-সন্দর্শনের আকুল-আশায় চেয়ে থকার পর পরম সাধু পুরুষ- ইব্রাহিম খলিলুল্লার সানিধ্য লাভের মতই ছিল। শীলা, ডাক্তার এবং নার্সদ্বয় ব্যগ্র-দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। আমীর যেন স্বর্গীয় শরাবন তহুরা পূর্ণ পিয়ালা হাতে নিয়ে ডাকলো “ রানী-ঈ”। অমনি রানী “ আমীর” বলে তার বাহুযুগলের মধ্যে নিজেকে লুকালো। আনন্দাতিশয্যে উভয়েরই চোখ ছেপে মুক্তা-অশ্র“ গড়াতে শুরু করলো। রানী খুব শক্ত করেই তার প্রিতমকে জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু বহুদিন পরে দীর্ঘ-বিরহের মিলন সুখ এমনি তার মনে উথলে উঠলো- সে থর থর করে কাঁপতে লাগলো, এবং সহসা সে শক্ত বাহুযুগল শিথিল হয়ে মাটীর আশ্রয় নিতে গেলো। মুহুর্ত মধ্যে শীলা ছুটে এসে রানীকে জড়িয়ে ধরে খাটের ওপর শুইয়ে দিলো। আমীর ও তখন যেন সর্বব্যধি মুক্ত হয়ে সুস্থতা লাভ করলো। সে দু’হাত উঠায়ে অনন্ত বিশ্বের মালিক পরম করুণাময় খোদাতায়ালার দরবারে তাদের এই আকস্মিক মিলনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। শীলাও সাথে সাথে সে প্রার্থনায় যোগ দিয়ে ভাবাবেগে বলতে লাগলো করুণা নিধান, তোমার করুণার সীমা নেইÑ একান্ত দয়া পরবশ হয়েই যখন এ দাসীর প্রথম –প্রার্থনা মঞ্জুর করেছ, তখন তাকে ক্ষমতা দাও যেন পুরোপুরি ভাবে তার কর্তব্য সাধন করতে পারে। আমার শৈশবের সখি রানী এবং পরম আদরের সহোদর আমীরকে যুগল বেশে দেখবার আশা বিগত তেরো বছর ধরেই এ ক্ষুদ হৃদয়ে পোষণ করে আসছি। তাদের মিলনে সাহায্য করবার জন্যই জীবন পণ করেছিলাম, শত-লাঞ্ছনা সয়েও সে আশা ত্যাগ করতে পারিনি। আজ অমি ধন্য- প্রাণখুলে তোমার কাছে শোকরিয়া আদায় করতে সুযোগ দাওÑ আর এদেরকে আজীবন বাহুর পাশেই আদর্শ প্রেমিক-যুগলের মত থাকতে দাও।
সহৃদয় ডাক্তারের বদান্যতায় এবং শীলার অকৃত্রিম ভালবাসার দরুন মধুমিলনে আমীর এবং শরীফা সে রাতের মত রানীর জন্য নির্দিষ্ট কেবিনেই স্থান পেলো। পাশের কেবিনে শীলাও রইলো। সে রাতের বাকীটুকু তারা নির্জনে নিজেদের ফেলে আসা দিনগুলি কি ভাবে কেটেছে, কাকে কতটা কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে, কে তাদের চির পেষিত মধুমিলনে বাধা সৃষ্টি করেছিল ইত্যাদি আলোচনার মাধ্যমেই কাটিয়ে দিল। তিন জনেই একথা স্বীকার করলো য়েÑ শীলার ভূমিকাই তাদের মিলনে সবচেয়ে মহত্তম। শীলা যদি রাস্তার পাশে পড়ে থাকা বান্ডিলাকার মৃতপ্রায় বস্তুটিকে না দেখতো, অথবা ভালভাবে নাদেখে কিংবা চিনতে না পেরে ফেলে আসতো, ষ্টেশনের কোন কর্মচারীর হেফাজতে হাসপাতালে পাঠানোর অনুরোধ করে নিজের দায়িত্ব সেরে আসতো তবে আর আজ এদের এ মিলন হতো না।
তাছাড়া , শীলা শুধু তাদের মিলনের জন্যই নিজের বাড়ী, ভবিষ্যৎ তথা সবকিছু উৎসর্গ করে সূদুর কলকাতায় এসে পৌঁছেছিল। সহোদও তুল্য ছোট ভাই আমীর ও ছোট বোন শরীফার জন্য তার কোমল প্রাণ কেঁদে উঠেছিল। তাই যখন আমীরকে বাধ্যতা মূলক ভাবে শরীফার মনেজগৎ থেকে সুকৌশলে সরানো প্রচেষ্টা তার মা-বাবা নিয়েছিলেন, শীলা শেষ বারের মত মামা-মামীর সাথে দেখা করেছিল। অনেক অনুনয়-নিয়েও মামার সে অভিজাত খানবাহাদুরী মনোভাব পরিবর্তন সমর্থ না হয়ে উপায়হীন- অথচ সুদৃঢ় পরিকল্পনা নিয়ে সে ড্রইংরুম ছেড়ে সোজা রান্নাঘরে মামীর পা’দুটো জড়িয়ে কাঁদতে সুরু করে। তার কথা রাখবে ওয়াদা না করা পর্যন্ত পা ছাড়বে না বলে পড়ে থাকায় মামীমার মন কিছু নরম হয়। সম্ভব হলে তার কথা রাখবেন বা চেষ্টা করবেন বলে ওয়াদা করাল খানবাহাদুর গিন্নী সে দিন শীলার হাত থেকে রেহাই পায়। তিনি শীলার বক্তব্য কিঞ্চিত আঁচ করতে পেরেছিলেন বটে তবে সে যে এভাবে তাঁকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করাবেন তা ভাবতে পারেন নি। তবও শীলার প্রতি তাঁর যথেষ্ট øেহ-মমতা ছিল; যেহেতু শীলা দূরসম্পর্কীয়া ভাগিনেয়ী হলেও নিজের শিক্ষার, ব্যবহারের মাধুর্যে ও ভক্তির গুণে খানবাহাদুর গিন্নীর আপন-ভাগিনেয়ীর চেয়েও বেশী আদর পেয়েছিল। রানীর প্রাথমিক শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের ভার তাই তারই উপর অর্পিত হয়েছিল। শীলাও মামীমার সাহায্যে নিজের অপারগ এবং অসমর্থ পিতার ব্যয় সংকুলান করে শিক্ষা পাবার প্রতিদানে রানীকে নিজের মনের মত করেই গড়ে তুলতে ব্রতী হয়।
কলেজের পরে শীলা বাড়ীতে ফিরেই রানীকে নিয়ে বসতো। সারাদিনে ক্লাসে কি হয়েছে সবই তাকে গল্পচ্ছলে শোনাত যা শুনে শুনে তার কচিপ্রাণে কলেজের সীমাহীন আনন্দমুখর শিক্ষার দিকে আকৃষ্ট হয়ে ওঠে। খেলাধূলা, ফাংশন, ইত্যাদিতে সে মাঝে মাঝে ছোট্ট রানীকে নিয়ে যেতো। সেখানে শীলার প্রতিভাময়ী বিভিন্নরূপ ও অভিনয় দেখে রানী হতবাক হয়ে চেয়ে থাকতো। প্রথম দিন তে রানী মঞ্চের শীলাকে চিনতেই পারেনি। কিন্তু স্টেজে যে মেয়েটি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, বাড়ীতে এসে শীলা কাছে তার খুবই প্রশংসা করে। ছোট বোনের মুখে (ছদ্মবেশী) নিজের প্রশংসায় সেও খুশী হয়। পরে তাকে গ্রীনরুমেই হাজির করে তার সামনে বেশ পরিবর্তন করে ষ্টেজে ওঠে। ঠিক , সেই মেয়ে! তারই বোন, গার্ডিয়ান শীলা এত চমৎকার অভিনয় করতে পারে। বাড়ী ফিরে রানীর আনন্দ দেখে কে। সে তার মা-বাবা এবং বাড়ীর সবাইকে এমন কি বাগানের বুড়ো মালীকে পর্যন্ত শীলার নিখুঁত অভিনয়ের সরল ব্যখ্যা শুনায়। তার প্রতিবেশী খেলার সাথী, স্কুলের হেড-মিস্ট্রেস কে পর্যন্ত বলে। পরবর্তী ফাংশনে রানী নিজেই তার মা –বাবাকে ‘শো’ দেখতে যাবার দাওয়াত কার্ড খান দিয়ে দু’শো টাকা চাঁদা আদায় করে দেয়। শো শেষে ঘরে ফিরে খান ও গিন্নী উভয়েই পঞ্চমুখে শীলার প্রশংসা করেন, তাদের দেয় চাদাঁর টাকাটা খুবই কাজে লেগেছে, এবং এমন একটি মেয়েকে ঘরে স্থান দিয়ে তারা যে সম্মান সেদিন পেয়েছিলেন গর্বে তাদের মন ভরে উঠেছিল। শীলার ক্রমোন্নতির দিকে তারা বিশেষ দৃষ্টি দেন। এতে শীলা ও তা মা-বাবা খুশী হয় ও বিনা বেতনে রানীকে শীলা গড়ে তুলতে থাকে।
শীলা কৃতিত্বের সাথে ডাক্তারী পাশ করে প্রাকটিস আরাম্ভ করে। রানী ইন্টামিডিয়েটে সর্বেŸাচ্চ স্থান অধিকার করে খানবাহাদুর পরিবারে শান্তির আবহণী বার্তা বয়ে আনে। এমনি দিনে খুশির তুফানের সাথে ভেসে আসে, আজকের দিনের আগ পর্যন্ত এক বছরের খুশীর বীজ। অশ্বথ গাছ বিশাল, তার অসংখ্য পত্র-পল্লবে ছায়া ঢাকা জায়গাটুকু, ক্লান্ত পথিকের শ্যন্তি দূর করে,বিমল আনন্দ দান করে। শাখায় তার পাখীর কূজন মন ভরে তোলে। কেউ তখন ভাবে নাÑ এই সুবিশাল গাছটির বীজ কত বড় এবং কেমন করে এত বড় গাছ হয়েছে। খান বাহাদুর পরিবারেও তেমনি অশ্বথ গাছের বীজ এসে পড়ে  তার পুরোনো দিনের বন্ধু পুত্র “তসলিম” দীর্ঘ পাঁচ বছর পর সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর ওপার শ্বেতকায়দের দেশ বিলেত থেকে ডিগ্রী নিয়ে। রানীর বাবাও এক কথায় রাজী হয়ে গেলেন বন্ধুপত্রের হাতেই মেয়েকে সমর্পন করে ধন্য হতে। পারিপার্শিক অবস্থা ও মোসাহেব দলও এ বিবেচনায় সায় দিলেন। রানীর মার মত নিতে গেলে তিনি কেবল বলেছিলেন মেয়ের মত নেওয়াও প্রয়োজন। তা ছাড়া- তার গার্ডিয়ান শীলার মতও বিয়েতে উপেক্ষীয় নয়। আমরা মা-বাবা হয়ে টাকাই ঢেলেছি- কিন্তু প্রাণের শেষ øেহবিন্দু দিয়ে নিজের আদর্শে তাকে গড়ে তুলেছে শীলা। শিক্ষার ব্যপারে, চরিত্র গঠনে ও সংসার ধর্মে গড়ে তোলার ভারছিল তার উপর। সে পুরোপুরি তার কর্তব্য পালন করে আসছে। এখন বিয়ের ব্যপারেও তারমত না নেওয়া, আমি মনে করি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়া উচিত হবে না অবশ্য যদি না কোন অসংগত কিছু সম্বন্ধ উত্থাপিত হয়।
কি? বাড়ীর গার্ডিয়ান, সেই হবে খান বাহাদুরের মেয়ের বিয়ের মাধ্যম! এর চেয়ে লজ্জাস্কর ব্যাপার আর কী হতে পারে? শেষে কিনা আমার আভিজাত্যে পানি ঢালার প্রচেষ্টা। কিছুতেই তা’ হবেনা। হবেনা। আমি কারো মত নিতে পারবোনা । আমার বাল্য বন্ধুর স্মৃতি- তসলিম। বিলেত ফেরতা, কি চমৎকার ছেলে, তার জুড়ি মেলেনা। তুমি দ্বিধা করোনা, সেলিমা!
সেলিমার মনের কোণে ভেসে উঠলোÑ সেই শান্ত মোহন ছবি যা’ গত চার বছর থেকে সে দেখে আসছে। খানবাহাদুর সাহেব মাঝে মাঝে তাকে দেখেছেন, চিনেন জানেন। কিন্তু সেলিমা কোনদিনই তার মনের গোপন কুঠুরি থেকে কথাটা মুহুর্তেও জন্যও বের করেন নি। এমনকি শীলাকেও আকারে ইঙ্গিতে জানতে দেননি। এ চিন্তা একান্ত তারই। কারণ সন্দেহের দোলায় তিনি দুলছিলেন, কিন্তু মন তবুও যেন সায় দিচ্ছিল।একান্ত তারই। মনের পর্দায় ভেসে আসতে লাগলো পুরেনো দিনের ছবিগুলো একে একে। বছর পাচেক আগের ঘটনা। খান বাহাদুর সাহেব গিয়েছিলেন তার চা বাগানে বেড়াতে। প্রতি বছর তিনি একবার চা বাগানে গিয়ে আয়-ব্যয়, বাগানের উন্নতি, কর্মচারীদের সুখ-সুবিধা ইত্যাদি পরিদর্শন করতেন এবং আগামী বছরের জন্য নির্দেশ দিয়ে ম্যানেজার সাহেবের উপর সমুদয়ভার ন্যাস্ত করে আসতেন। ম্যানেজার সাহেবও অকৃত্রিম ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ বাল্যবন্ধুর বৈষয়িক উন্নতির দিকে খেয়াল রেখেÑ নিজের মনে করে এ বাগান চালিয়ে আসছেন গত পনর বছর থেকে। তখন সবে মাত্র –খান সাহেব সেলিমা বেগমকে বিয়ে করেন। খানবাহাদুর উপাধি উনি পেয়েছিলেন ম্যানেজার সাহেবে ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে উৎকৃষ্ট মানের চা’ প্রস্তুত ও বিলেতে রপ্তানীর মাধ্যমে।
বিয়ের বছর খান সাহেব সেলিমাকে নিয়েই চা-বাগানে গিয়েছিলেন। ম্যানেজার সাহেবের বাংলোতেই প্রথম দিন ওঠেন, যদিও ডাকবাংলো তাঁর আসার পূর্বেই সুসজ্জিতকরে রেখেছিলেন ম্যানেজার মনীবের জন্য এবং বাল্যবন্ধুর পতœীর অভ্যর্থনা মানষে। রাতে ভোরে সময় দিল খোলা ভাবে আলাপ হয় বন্ধু ও বন্ধুপতœীর সাথে। ম্যানেজার তথা স্বামীর বন্ধুকে খানগিন্নী অনুরোধ জানান চা-বাগানের উন্নতির জন্য আরো বেশী খেয়াল রাখবার জন্য। যেন তাঁর এ সংসারে আগমন শুভ সূচনা করে। তিনি ম্যানেজারকে বন্ধুভাবেই গ্রহণ করেন। তাই বন্ধুর ছেলে মেয়ে দু’টির জন্য সু-শিক্ষার ব্যবস্থাপনার জন্য তার কাছে Ñশহরে নিয়ে আসতে চান। বাচ্চা দু’টি শহরের নামে পাগলপারা, তাদের মায়েরও ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ম্যানেজার রাজী হননি। কেন , কি ভেবে তা বলেন নি। খানগিন্নীও বেশী জিদ করে নিমা বাপ ছেড়ে এত ছোট বাচ্চারা তাঁর কাছে থাকতে পারবে কিনা ভেবে। তবে অনুরোধ করে আসেন একটু বড় হলে যেন শহরে নিশ্চয় পাঠানো হয়। খান সাহেবও হাঁ করলেন। বন্ধু খান সাহেব শহরে ফিরে এসে নিজ কাজে ডুবে গেলেন, খান গিন্নীও বেগমে উন্নতি হলেন, পার্টি- শো ইত্যাদিতে মশগুল। চা বাগানে ফেলে আসা কথাগুলো ভুলে গেলেন।
ওদিকে ম্যানেজার লক্ষ্য করছিলেন  মনীব-বন্ধু ফিরে যাবার পর বাচ্চা দুটো ও তার মা যেন একটু উদাসীন ভাব! একরাতে খাবার টেবিলে আলোচনা জুড়লেনÑ আচ্ছা লীলা, তোমার বন্ধু পতœী যে বাচ্চাদুটোকে শহরে ফাঠাতে বলে গেলেন, একদিন যাওনা ওদের নিয়ে বেড়িয়ে আসো। ওদের যদি থাকতে ইচ্ছে হয় রেখে এসো। আমার তো অবসর নেই আগামী মাসে বিদেশের এক মেলায় পাঠাবার জন্য কিছু ভাল চা তৈলীর ব্যপারে খুবই ব্যস্ত। আর জান, যদি আমাদের চা’ সেখানে ভাল বলে বিবেচিত হয়, আমরা খুবই সুনাম পাবো সাথে মাথে ব্যবসায়েও উন্নতি হবে। তুমি যদি রাজি হও, তার করে দেই, কেমন? না বাপু , আমার শহর দিয়ে কোন কাজ নেই, গাঁয়ের মানুষ, এই জঙ্গলই ভাল। আমি বলছিলাম কি! ছেলে মেয়ে দুটো যদি শহরে থেকে লেখাপড়া শিখে মানুষ হতে পারে তবেই শান্তি। ওদের সেখানে পড়া ব্যবস্থা করো- মাঝে মাঝে এসে আমাকে দেখে যাবে। তাই হবে আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি- তুমি যাবার ব্যবস্থা করো কেমন? আমি যচ্ছি বাগানের দিকে বিকেলে ফিরে এসে দেখি যেন সব ঠিক ঠাক ,আগামী ভোরে যাওয়া ঠিক হলো

Leave a Reply

Categories

%d bloggers like this: