News Updates

Home » ব্লগ » উপন্যাস » ভালবাসার জন্ম কোথা – ৪

কর্তব্যময়ী ভালবাসা
সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার ভালবাসার নামই কর্তব্যময়ী ভালবাসা বলা হয়েছে। যেহেতু মানব সমাজ- যে কোন ধর্মমতেই হোক না কেন- মানুষের উৎপত্তি যে ভাবেই হোক না কেন- সন্তানের প্রতি যে মায়া-মমতা, অন্ধ-ভালবাসার ব্যাতিক্রম নেই। অনেক উদাহরণও এর সাক্ষ্য দেয়- যেমন সুপুত্র- কুপুত্র মায়ের সকল সমান। অর্থাৎ সন্তান যেমনই হোক মাতা পিতার কাছে সেই ভাল। মানব সৃষ্টির পর থেকেই আজ পর্যন্ত দুনিয়ার সমুদয় জাতির – সর্বদেশের পিতা-মাতার কাছেই আপন আপনসন্তান খুবই ভাল, আদুরে, স্নেহ-ভালবাসা পেয়ে আসছে। এটা যেন প্রাকৃতিক নিয়ম। এমনি কঠোর এবং অপরিবর্তিত নিয়ম যে –তার কোন রকম ব্যাঘাতই এ পর্যন্ত হয়নি।
প্রকৃতির লীলার শেষ নেই। কত শত শত পরিবর্তন, পরিবর্ধন হচ্ছে কিন্তু এ নিয়ম চাঁদ-সুরুজের মতই অটল-অচলভাবেই আছে। কত রাজা-মহারাজা বাদশা পৃথিবীর বুকে এসে নতুন নতুন শাসন-ব্যবস্থার বিধান করছেন, কিন্তু এই কর্তব্যময়ী – ভালবাসার কোনই নতুন পদ্ধতির বিধান করতে পারেননি। দুশো বছর আগে মুসলমান বাদশাহ গণের আমলে এ ভালবাসা যেমন ছিল, ইংরেজ যুগে তার কিছুই ওলোট-পালট হয়নি। পাকিস্তান লাভের পরও এর কোনরূপ ভাবান্তর ঘটেনি। আজও মাতাপিতা তেমনি আদর স্নেহ ভালবাসা দিয়েই নিজেদের সন্তান পালনে তৎপর। এই তৎপরতার ভিতর দিয়েই বুঝা যায়- মাতা পিতার অন্ধ ভালবাসার ফল কতদূরে গিয়ে পৌঁছতে পারে। এই অধ্যায়ের শূল উদ্দেশ্য হবে কর্তব্যময়ী ভালবাসার একটি দৃষ্টান্ত।
সংসার সমুদ্রে মানব-জীবন যেন একখানি ভাসমান ছোট্ট নৌকা! জন্মের পর থেকেই মানব শিশু যেন খেলনার নৌকার মতো, পরিবার-রূপ অপরিসর নদীর ছোট ছোট ঢেউ এর তালে তালে নেচে- খেলে বেড়ে ওঠে, এবং ক্রমশ পরিনতির দিকে ধাবিত হয়। প্রকৃতির মৃদু-মধুর হাওয়ার দোলা যেন তার শিশু-মনকে প্রতিনিয়তই এক অসীমের পানে টেনে নিয়ে যায়। শিশুর কোমল-কচি-মন তখন সেই স্বচ্ছ-নদীর সুশিতল হাতছানি পেয়ে আপন-ভুলে গা এলিয়ে দেয়। কখনও বা আধো আধো ভাঙ্গা স্বরে খেলার সাথীর ডাকে সাড়া দেয়। কখনও তার মনের খেলাঘর নানা রংয়ে সাজিয়ে আনন্দে হাসির লহরী তোলে। কখন ও মনপুত না হয়ায় বা ‘আচকা’ দমকা – হাওয়ায় তার কসুম কলি দিযে সাজান খেলাঘর কেপেঁ ওঠে। তখন শিশু-মন নিজেকে নিতান্ত অসহায় ভেবে কেঁদে ওঠে, পিতা-মাতা বা অনুরূপ দরদীদের দিকে ছুটে যায়। আবার হয়তো পরক্ষণেই সবকিছু ভুলে গিয়ে ছেড়ে যাওয়া খেলা ঘরে ফিরে আসে।
এমনি করে শিশুর মন দিনে দিনে বাড়ে এবং কিশোর অবস্থায় এসে পড়ে। এই সময়ে সমবয়সীদের সহযোগিতা এবং সহানুভূতি তাকে এক নতুন ভাবের রাজ্যেও পথ দেখায়ে দেয়। অজানা দেশের কত অদেখা ছবির কল্পনাই তার মনে জাগিয়ে তোলে অতুল আনন্দ, অফুরন্ত আশা এবং আকুল আগ্রহ। আশায়- আকাঙ্খায় ভরপুর মন তখন পিতা-মাতা, পরিবারের মুরুব্বিদের প্রতিটি আচরণ, কার্যকলাপ মনোযোগের সাথেই অনুসরণ করেতে থাকে।
শৈশব থেকে কৈশোরই মানবের শিক্ষার প্রকৃষ্ট সময়। এ সময় মানব-মন খুবই নির্মল থাকে, এবং অতি সহজেই মনের গতি যে কোন দিকে ফিরতে পারে। প্রত্যেক পিতা – মাতা, তথা মুরুব্বিদের উচিৎ যে তারা খুবই সাবধানে তাঁদের শিশু বা কিশোর সন্তাদের সঙ্গে ব্যবহার করেন, এবং যাতে তাদের ভবিষ্যৎ সুখময় হয়ে ওঠে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখেন। শুধু সুশিক্ষা এবং কুশিক্ষার ফলেই মানবশিশু ভাল এবং মন্দ হয়ে থাকে। এর জন্য একমাত্র মা-বাবা এবং অন্যান্য নিকটতম আত্মীয়েরাই দায়ী। এসময়ে তারা যে রকম শিক্ষা দেন, অচিরে সেই অনুপাতেই ফল ভোগ করে থাকেন। কাচাঁ-বেত যেমন ইচ্ছামত বাঁকা করা সহজ- শিশু বা কিশোরদের কচিমনও তেমনি ইচ্ছামত ফিরানো যায়। কিন্তু ওই কচি বেতই কিছুদিনে শুকিয়ে গেলে অতিকষ্টের আর বাঁকা করা যায় না বরং মচকে যায়। তেমনি শিশু বা কিশোরদের কচিমন ও অনাদরে – অবহেলায় কিছুদিন পরে মচকে যায় , ভবিষ্যতে তার দ্বারা তেমন সুফল আশা করা একরূপ বৃথাই হয়ে পড়ে।
বর্তমানে আমাদের দেশে শতকরা আশি অথবা তারও বেশী গরীর। সন্তানদিগকে সময়মত শিক্ষা দেওয়া তো দূরের কথা, সময়মত খাবার, পরবার দেবার মত শক্তিও খুব কম পিতামাতারই অছে। প্রথমত এই গরীবতাই কোমল-মতি শিশুদের অনিষ্টকারী ভীষণ শত্র“। কাঁচের মতই শিশুর মন ক্ষণ ভঙ্গুর, যখন খুশি একটা কিছু আবদার করে বসে। গরীব মা-বাবার দেবার শকতি নেই বলে তাকে নানারকম মিথ্যা কথায় কোনমতে সান্তনা দিয়ে নিজেরাও শান্তি পায়। কিন্তু নিজেদের মূর্খতার দরুন, খুব কম মধ্যবিত্তেদে ঘরের একথাটা খেয়াল করা হয়। ফলে যখনই সন্তান তার মা-বাবার মিথ্য-অন্যায় বুঝতে পারে- তখন সেও নিজেকে নানরূপ আধো আধো ভাষায়, ভয়ে ভয়ে ঐ পথে চালিত করবার প্রয়াস পায়। অতি অল্প বুদ্ধিমান পিতা-মাতাই সন্তানের এসব নতুন ফন্দি খেয়াল করে থাকেন, অথবা অতি তাচ্ছিল্য ভরে হেসে উড়ায়ে দিয়ে কৌতুক অনুভব করেন। পরম আদরের দুলাল, সন্তানের ভবিষ্যৎ তারাঁ একটুকুও ভেবে দেখেন না।
অতি আদরের দুলাল তখন ধীরে ধীরে মা-বাবা ইত্যাদী মুরুব্বিদের কাছে স্নেহের পাত্র হিসেবে অনেক গুরুতর অন্যায় করেও রেহাই পেয়ে থাকে। এক দুই করে এমনি ভাবে প্রতিবেশী, গ্রামবাসীদের মধ্যে বেশ একটু পরিচিত হয়ে সে আদুরে দুলাল বেশ খানিকটা অন্যায় করতেও দ্বিধা বোধ করেনা। প্রথমত হয়তো কেউই কিছু বলে না বা সামান্য গালি-গালাজ অথবা দু’চারটে চপেটাঘাত মেরেই তার ভবিষ্যৎ রোধ করে থাকে। ক্রমে দুলালের কীর্তি-মালা প্রকৃতির সাথে একটু মিলিয়েই, গতিবেগ বৃদ্ধি পেতে সুরু করে এবং যৌবনের প্রারম্ভেই হয়তো বৃদ্ধ পিতা –মাতার চেয়ে অনেকাংশে খারাপ এবং নিন্দার কাজ করে বসে। হতভাগ্য বৃদ্ধেরা তখন সন্তানের কৃতকার্যের জন্য অনুতাপ, অভিষাপ ইতাদি করেই ক্ষান্ত হয়। মোহান্ধ সন্তান তো তখন নিজের সব-কিছুই বেশ একটু একটু বুঝতে পারে, আমিষ – নিরামিষাদীর আস্বাদও সে টের পায়। কাজেই সে বৃদ্ধের অসার -দম্ভ হিতোপদেশ বিষদৃশ্য মনে করে কানে আঙ্গুল দেয় অথবা দূরে সরে পড়ে।
আমরা বাঙ্গালী, বাঙ্গলা প্রবাদ – পুরুষের চল্লিশে দাঁত পড়ে খসে, আর মেয়েরা কুড়িতেই বুড়ি’ শিক্ষিত না হলেও আমরা ধর্মভীরু। শরীয়তের দোহাই দিয়ে বেড়া পার হতে পারলেই হল, ওপারে গিয়ে গলায় বিধা কাটা ছাড়াতে না পারলেও দোষের ভাবিনা। কারণ সবই ‘বিধির বিধান’। সবচেয়ে বড় কথা আমরা গরীব চাষী, মেহনতী বা মজুর। আমাদের সংসারে নিত্য অভাব। মেয়েওয়ালারা গরীবতার দায়ে মেয়েকে শিক্ষা তো দিতে পারেই না, তা’ ছাড়া মেয়ে আট বছর পার হলেই তার শাড়ী জামা যোগাড় করা দায়। অতএব দেখে শুনে একটা ভাতুড়ে জামাই এর হাতে মেয়েটা সপেঁ দিতে তৈরী হয়ে পড়ে। ছেলের বাবা বা অভিভাবক তেমনি গৃহীনির কুড়ি পেরিয়ে যাবার সাথে সাথেই পর পারের নিত্য-নতুন ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যাবার আগে আরো দু একটা বোঝা চোখের সামনে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে মরতে চায়। সাদাসিদে ধরণের একটা ছুঁড়ি যোগাড় করে নাছার-ছোকরাটাকে কোনমতে অন্ধকুপের মত কুড়েঁ ঘরটার মধ্যে আবদ্ধ করতে কৃতÑসংকল্প হয়ে পড়ে। তাছাড়া গেরস্থের সংসার,-কাজ কাম যা কিছু আছে, তাও দেখাশুনা করবার মত শক্তি গৃহীনির আর নেই। সে এখন চায় অবসরÑ পক্ষান্তরে ছেলেটাও আজকালকার আবহাওয়ায় একটু খানি নেচে খেলে বেড়ায়। চো’তের চাঁদনী রাতে পাড়ার ছোকড়াদের সাথে মাঠে মাঠে ঘুরাফেরা- খেলাধূলা করে বেড়ায়- আরো কতকি। বিয়েটা দিয়ে বুড়ো বয়সে নিশ্চিন্তে একটু ঘুমোবার চেষ্টাতেই উঠে পড়ে লাগে।
ঊহু কষ্টে খেটে খুটে যা কিছু করেছিল, মিলওয়ালাদের নেহাৎ মেহের বানীতেই পনের টাকা মণ দরে দেড়মণ পাট ও দশ টাকা দরে দুই মণ আখের গুড় বিক্রি করে টাকা গুলি পুরোনো বীজ ধানের কলসীতে জমা রেখেছিল। রাতে শুয়ে গিন্নীর সাথে পরামর্শ করে- ছেলের বিয়ে কি ভাবে দিতে হবে- কেমন বৌ ঘরে আনতে হবে। ভোরে উঠে একথালা ‘পান্তা’ খেয়ে ও গাঁয়ের করিম শেখের মেয়ে দেখতে বুড়ো রওনা হ’ল। করিম শেখও ঠিক ছলিমের বাপের মতই পঞ্চাশের সিড়িঁতে পা দিয়েছে। বড় ছেলে দুটিকে সে যেন এক জোড়া তাজা বলদের মত করেই গড়ে তুলেছে। গত শ্রাবনে একই বাজারে দশমণ পাট বিক্রি করে দুটি সোনার চাঁদ বৌ ঘরে এনেছে। খোদার ফজলে বছর পেরুতেই তাদের কোলে এসেছে- স্বর্গের দান দু’টি ছেলে। বুড়ো-বুড়িদের তাই আর আনন্দ ধরেনা,  অবসরের দিনগুলি তারা এই নবজাত শিশু দু’টিকে নিয়েই বিমল আনন্দে উপভোগ করে। মোটকথা- তারা বেশ সুখী। তবে ভাবনা যে একেবাই নেই তা’নয়। মানুষ যতদিন সংসারে বেচেঁ থাকে, কিছু না কিছু একটা তার সম্বল, আশা চাই-ই। বুড়ো-বুড়িদের ভাবনা শুধু মেয়ে ছকিনাকে নিয়ে। তারা মাঝে মাঝে ভাবে ছকিনাকে একটা সৎপাত্রে দিতে পারলেই তারা নিশ্বাসটুকু একটু জোরে ফেলতে পারে-যাবার আগে ছোট মেয়েটিকে তারা জামাইয়ের সাথেই দেখে যেতে যায়। ছকিনা তো ধান-ভানা থেকে শুরু করেÑ ঘর লেপ দেওয়া, মোটা কাপড়ে পুরোন সূতোয় কাথাঁ সেলাই, ভাত রাধাঁ, পাট শুকানো, কাপড় কাচা ইত্যাদি গরীবের সংসারে দরকারী সব কাজই শিখেছে। এই কচি বয়সেই সে তার মায়ের একমাত্র সম্বল কাজের দোসর। বুড়ো করিম শেখ আজ সেই ছকিনার বিয়ের কথাই তুলছে, ভিন -গেরামের ছলিমের সাথে।
গেরস্থের বাড়ী- মোটা ভাত- মসুর ডাল- পুঁই শাক-পুঁটি মাছের তরকারী এবং শেষে একবাটি কালো গাইটার ঘন জ্বাল দেয়া দুধ ও আখের গুড়- অতিথি সেবায় সামান্য আয়োজন। খাওয়ার পর একটা পান মুখে ফেলে নারকেলের হুকোয় ফুড়–ত্ ফুড়–ত্ গোটা কতক টান দিয়েই নেশার ঝোঁকে দুই বুড়ো, ভাবী-বেযায়ে চালিয়েছে ছকিনার বিয়ের আলাপ। মাঝে মাঝে পাটেক জমী- রবি ফসলাদি গত বারে কে কিরকম পেয়েছে তাও জিজ্ঞেস করতে কেউই ভুলিনি। কাজেই অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেল। পনর দিন পর শ্রাবনের ২৭শে রবিবার রাতে বর আসবে। গহনা – চুড়ি-ঝুমকা-চন্দ্রহার- তিনখানা লালপেড়ে মিলের শাড়ী, এক পেয়ালা শুপারী-একপণ পান-খুদিরামের গুড়-চিনি মেশানো কদমা-বাতাসা-দু-সের। একশিশি তরল আলতা, আয়না –চিরুনি। আর মেয়ে-মহলের জন্য কমপক্ষে গোটা সাতেক টাকা!
নির্দিষ্ট দিনে কথামত ছলিমের বাপ নতুন-বৌ ঘরে এনে যেন হাঁপ ছেড়ে বাচলো। অপর দিকে ছলিম-ছকিনা বাসর-ঘরেই শুরু করে দিলÑ কি করে মার হাত থেকে কালই হাড়ি –পাতিল ছাড়িয়ে নিয়ে গিন্নি হওয়া যায়। বাপের মাটীর কলসই বা আর ক’টা চাঁদির টাকা আছে- তারও খোজ মনেবার চেষ্টা বিফলে গেলনা। এইরূপ নানারকম আজগুবী আলোচনায় তাদের অনেক দেরী হয় এবং ভোরে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়ে গেল। বুড়ী মা’ ভোরে ঘরের দুয়ারে এসে ডাকা-ডাকি, শেষে ‘কাল জমানার ’ দোষ ইত্যাদি পিন্ডি দিতে শুরু করে দিল। অগত্যা  আরামের ঘুমে ব্যাঘাত হওয়ায় (নব-দম্পতি) দরজা খুলে বেরিয়ে এসে বললো – “দেরী হয়েছে হয় তো একটু, তো চিল্লাও কেন? ঘরে নতুন বৌ  এই বুড়ি-ফজরে উঠে চেঁচিয়ে গাঁ মাথায় কর’ছ ।একটুকু আক্কেল নেই। আর এই বুড়ো বয়সে তোমার আক্কেল থাকবেই বাকি করে? মনে করে দেখো-  পিছনে ফেলে আশা দিনের কথা। যাও- এখন একটু পরকালের ভাবনা ভাববে কি, এসেছ দোর -গোড়ায় হেকে গিন্নীপনা দেখাতে! তোমাকে আর অতটা কষ্ট করতে হবে না। একটু বরং আরাম করোগে, আমরাই পাক করে তোমাদের খাবার যোগাড় করব” একই ঢিলে দুই পাখি মেরে ছলিম-ছকিনার দিকে একটু আড় চোখে চেয়ে নিলে, বুড়ো মা-বাবাকে চিরদিনের জন্য সংসারের তাপ-জ্বালা থেকে মুক্তি দিয়ে দিলে।
নতুন বৌ- নতুন ঘর সংসার- তাতে আবার পুরোপুরি ঘুম না হওয়ায় চোখ ঢুলু ঢুলু, কোন মতে হাত পা পুড়িয়ে ডাল-ভাত পাক করতে বেলা গড়িয়ে পড়ল। ক্ষিদের জ্বালায় বুড়ো –বুড়ির পেট-জ্বলে তবু খাবার মিলে না। বেচারা বুড়ো, বৌমাকে একটু তাড়াতাড়ি খাবার দিতে বলায় বৌ পুতে উভয়েই জোর গলায় জবাব দিল- ‘চুপ করে বসে থাকো, পরপারে খাবার সামনে পাবে চেঁচাতে হবে না। আর এতটা যদি খিদে পেয়ে থাকে তো পাক করে নিলেই হত এতক্ষণ, একটু গতর খাটালে তো আর পাপ হতো না।
বিপদ আসন্ন ভেবে বুড়ো কপালে হাত দিয়ে খোদার কাছে নির্ভরতা চাইলে। দু’চোখ ছেপে তার পানি এলো  আফসোস! কাল সেই ছিল সংসারের মালিক, ছেলে আর বৌ তার কত আদরের ধন। আর আজ তাদেরই মুখ দিয়ে কি মিঠে সুর বেরুচ্ছে। দুনিয়া রসাতলে যাবেনা কেন ? ধন্যরে বাঙ্গালীর অশিক্ষিত – অনুন্নত ঘরের ছেলে- বৌ! অন্য তাদের মা-বাপ, আর শত ধন্য তাদের শিক্ষায়! শুধু শিক্ষার গুনেই পাড়াগাঁয়ের কত-শত গরীব ঘরে প্রায় পরিবারের দৈনিন্দন জীবন এমনিই ভয়াবহ। শিক্ষার সুবিমল আলো সেখানে- দক্ষিণ আফ্রিকার ‘‘অন্ধকার –মহাদেশের ’ মতই প্রবেশ লাভ করতে পারেনি, তাই সেখানকার প্রায় পরিবারই দিনের পর দিন আঁধারের নিবিঢ় ছায়ায় ঢাকা পড়ে আসছে।
হায়রে নিষ্ঠুর প্রকৃতি! শিক্ষার অভাবেই শুধু আজ মানুষের এতদূর অবনতি! এর জন্য দায়ী কে ? মানব সমাজ – সমাজের নেতৃস্থাণীয়রা! তারা কেন ফিরে চায়নি এহেন গরীবের কুড়ে ঘরের দিকে ? এরাও তো মানুষ, তবে কেন এদের জন্য এতটা অবহেলা? সামান্য অক্ষর জ্ঞানও যদি এদেরকে দেওয়া যেতো, তা হলে নিশ্চয়ই এরা এতটা দুখ যাতনা ভোগ করতো না।
কিন্তু কেন সে ব্যবস্থা হয়নি? এর মূলে রয়ে গেছে উচুদরের সামাজিকদের ঈর্ষালু-চোখের- তেরছা –চাহনী! এরা শিক্ষিত হলে তাদের গোলামী করবে না, পদলেহন করবে না, তারাও তৃপ্তির সাথে চলে ফিরে সুখ পাবে না। কিন্তু কতদিন? খোদার রাজ্যে-প্রকৃতির ব্যঘাত, এরূপ অবিচার কতদিন টিকবে? সে দিন অতি নিকটে।
আজ যে রাজা, কাল সে ভিখারী, আজ যে গরীব, কাল তার ছেলেই ধনী-মানী-; এই তো দুনিয়ার প্রকৃতির নিয়ম।

সাময়িক বা স্বার্থময়ী ভালবাসা
সংসার বড়ই কঠিন স্থান! প্রতিটি পথই তার দুর্গম, লোভনীয় এবং সর্বগ্রাসী উপকরণাদিতে ভরপুর। অতীতের তালে তাল রেখে বর্তমানকে কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যত তার খুবই দুঃখময় হয়ে পড়ে। তাই লোভী এবং স্বার্থান্বেষী মানব পুরোপুরি হিসাব ঠিক করতে না পেরে অনেক সময় দুখের সাগরে ভেসে একাধারে মোহান্ধ জগৎকে হাসায়, এবং পক্ষান্তরে ধীর ও ভাবুকদের মনে জ্ঞান ও উৎসুক জাগায়।
সংসারে যার যতটুকু শোভা পায় তার চেয়ে কম বা বেশী কিছু করতে গেলেই প্রকৃতির ব্যঘাত ঘটে, – ফলে চির-পোষিত- আশা-তরুও সমূলে উৎপাটিত হয়ে যায়। পৃথিবীর ইতিহাস যে সমুদয় মহাপুরুষদের স্মৃতি বুকে ধরে গৌরবান্বিত, -তাদের প্রায় প্রত্যেককেই প্রথম জীবন বহু দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করে শেষে মহীয়ান হয়েছিলেন। নির্বোধ আমরা, তাই শত শত মহাপুরুষের জীবনী পাঠের পরেও- কি জানি কেন ভুল করে বসি। হয়তো বা এটা দুনিয়ার রীতি। নইলে এরকম ভুল ধারণা মানুষের হবে কেন ?
“একটি জিনিষ দিয়ে কি কোন দিন দুটি দিলকে সান্তনা দেওয়া যায় ?নিশ্চয় না! কিন্তু আমরা সেটা বুঝি কোথায় :নেশায় মেতে পাগলের মত মরীচিকার পিছে ছুটায় যেন আমাদের ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাময়িক ভাবে একটু হয়তো ভাল লাগতে পারে কিন্তু তা নিছক প্রলাপ ছাড়া আর কিছু নয়। যে জিনিস নাগালের বাইরে তাকে বার বার ধরবার চেষ্টা করার অর্থ অসাবধানতায় নীচে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পাবার পূর্ব অঙ্ক। এতে শুধু নির্মল হৃদয় কলুষিতই হয়- পবিত্রের নামও সেখানে নেই। কারণ স্বপ্ন (অলীক) প্রায়ই ভিত্তিহীন, এবং সেই ভিত্তিহীনতাই যার ভিত্তি (ফাউন্ডেশন) সেটা যে কত দূর সত্য তা একমাত্র বিকৃত –মস্তিষ্ক ছাড়া সবাই বুঝতে পারে”।
“ জগৎ পরিবর্তনশীল এবং জীব তার অনুসরণ ও অনুকরণ কারী। মানব-হৃদয় স্বভাবতই কোমল। যত বড় পাষান হৃদয় হোক না কেন, তার ভিতরেও কিছু না কিছু কোমলতা (রস) আছেই। সাধারণত তা দেখা না গেলেও সময় বিশেষে তার প্রকাশ পায়। বহুদশীরা বলেনÑ পাহাড়েরও প্রাণ আছে- অত্যুঙ্গ পাহাড় ফেটেও তাই পানি (ঝরণা) বেরোয়। পরিবর্তনশীল জগতের ফ্রীত আবর্তনে (ঋতু-পরিবর্তনে) মানব, তথা জীব-জগৎ বিভিন্ন ভাব ধারণ করে এবং ভিন্ন ভিন্ন রুচি অনুভব করে থাকে।
“ঋতুরাজ বসন্ত কাল শুকনা প্রায় গাছে মুকুল গজায়, নতুন নতুন ফুলে ফলে সুশোভিত করে। বসন্তের চির সাথী কোয়েলের প্রাণে এক অপরূপ ভাবের সূচনা করে। মৌমাছিরা মধুর গুঞ্জনে কলি ও কূঁড়ি গুলিকে মাতোয়ারা করে তোলে। বসন্ত পৃথিবীতে কত বারই তো আসে-কিন্তু কই গতবারের কলি – কুঁড়ির কোনটাই তো তার প্রাণে নব নব ভাব জাগায়ে দিতে পারে না। সে (ঋতুরাজ) চায় শুধু কলি কুঁড়ি অর্ধ মুকুলিত ও পূর্ণ বিকশিত কসুম-
“ ঝরে পড়া বা ঝরা-মূখী ” কোন ফুলই তো তার সমূদয় সুগন্ধরাশি ঢেলে দিয়েও বসন্তেও মন পায়না! কেন? একই জিনিস – সময় এবং অবস্থা বিশেষে অতীব আগ্রহের এবং উপেক্ষার খেলনায় পরিণত হয়ে থাকে। ইহাই প্রকৃতির নিয়ম।

Leave a Reply

Categories

%d bloggers like this: