News Updates

Home » ব্লগ » উপন্যাস » ভালবাসার জন্ম কোথা – ১

ভালবাসা কথাটা আজকাল ছেলে-বুড়ো প্রায় সব লোকের মুখেই শোনা যায়। ভালবাসা বলতে তারা কি বুঝেন তা তারাই জানেন। আজ প্রায় বিশ বছরের অভিজ্ঞতায়ও আমি এর প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারিনি। চেষ্টা যথেষ্টই নিয়েছি কিন্তু সাফল্যের শেষ মঞ্জিলে পৌঁছতে পারিনি। না পারার কারণও যথেষ্টই রয়ে গেছে।

প্রথমতঃ ভালবাসা শিক্ষার কোন রকম আদেশ বা উপদেশ এ পর্যন্ত আমি কোন গুরুজনের কাছ থেকে পাইান। উচ্চ শিক্ষিত না হলেও স্কুল শুরু করে আজ অবধি নাটক নভেল ইত্যাদি অনেক বই দেখেছি- কোথাও ভালবাসা শিক্ষার কোন ইঙ্গিত নেই। শুধু এই টুকুই জানতে পেরেছি যে ভালবাসা আমাদের দেশজাত কোন বস্তু নহে- পক্ষান্তরে এটা কোন দূর দেশ থেকেও আমদানী করা হয় না। ভালবাসা মনজ বস্তু বিশেষ, এটা মানুষের মনে আপনা থেকেই সময় বিশেষে জানেন, এবং আপনা থেকেই সময়ের বিপর্যয়ে মনে মনেই লোপ পায়। তাই এর পুরানো-বীজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তা ছাড়া মনও এক রকম ক্ষেত্র নহে যে, প্রত্যেক মনে একই রকম ভালবাসা জন্মিবে। রুচি এবং অবস্থাভেদে এর বিকাশ এবং বিলাপ হয়। ভালবাসা নিয়ে বহু মানবী খেলা করে গেছেন, কিন্তু শেষে শুধু নিজের মাটির দেহ মাটিতেই মিশিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। সাফল্যের শেষ মঞ্চে বিজয়ের পূর্ণ টীকা খুব কম লোকের ভাগ্যই জুটেছে।

পূর্বা কালের ভাস্কো – ডা – গামা, ম্যাগলিন, কলম্বাস প্রভৃতি দেশ আবিস্কারকগণ পৃথিবীর ইতিহাসে আজও সমভাবে উদিত আছেন। বর্তমান যুগেও বিজ্ঞান বলে অনেক কিছুই আবিষ্কার করা হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু ভালবাসা কোত্থেকে উৎপত্তি হয়েছে কেনই বা পূর্ণাঙ্গ না পেতেই আবার ধংসপ্রাপ্ত হয়, কোথায় যায়, আবার কেন অন্য মনে জন্মায়, তা আজ অবধি কোন মহারথীই আবিষ্কার করতে সমর্থ হননি। পৌরানিক যুগের বহু নামজাদা বৈদেশিক বনিকদের নামও আমরা জানি। প্রাণান্ত চেষ্টা করেও তারা মনি-মুক্তা ইত্যাদি আহরণ করেছিলেন। কিন্তু সেই ইতিহাসই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, সিন্দবাদের মত নির্ভীক এবং ধৈর্যশীল বণিকও আমাদের এ ভালবাসারতœ লাভে সমর্থ হননি। সেকালে আমাদের দামেস্কাধিপতি নবীন মহারাজ এজিদও কোটি কোটি লোককে কোরবানী করে, ধনাগার নিঃশেষ করে, এমনকি রাজধানীর বিনিময়েও তার ভালবাসার পুতলা মাটীর-মানুষ জয়নাবের ভালবাসা পাননি। এতে বুঝা যায় ভালবাসা কৃষি-পণ্য, বানিজ্য বা বিজ্ঞান-বলে লাভ করা যায়না। এটা মানুষের মনে জন্মে এবং লোপ পায়। পার্থিব- সম্পদ, ধন-ঐশর্যের বলে বা বাহুবলে ভালবাসা লাভ করা যায় না।
যে ভালবাসার মীমাংসা উপরিলিখিত মহোদয়গণ করতে চাননি তা’ নিয়ে আমার মতো মানুষের মাথা-ঘামানোর দরকার করেনা। কিন্তু আজকাল রাস্তা-ঘাটে, বাজারে এমনকি অফিসে পর্যন্ত এই ভালবাসা নিয়ে কানা কানি, হানাহানি চলছে। তাছাড়া সিনেমা থিয়েটার, নাটকে যা দেখানো হয় তার প্রায় প্রত্যেকটীতেই এই যাদুময়ী ভালবাসার পরশ-কাঠির ছোঁয়াচ পাওয়া যায়। সেখাানে যতলোক জমা হয়, তার বোধকরি শতকরা ষাট ভাগ লোকও ভ’ এবং ব’ এই দুটি অক্ষরেরবিশেষ পার্থক্য-জ্ঞান রাখেনা। বাঙ্গালীর ছেলে বাঙ্গলা কথার প্রকৃত অর্থ বুঝতে তেমন চেষ্টা পায়নি যেহেতু পাকিস্তান, পাবার পর হতেই এর নামও হয়েছে ম হ ব্ব ত।
ভালবাসা বিদেশ থেকে আমদানী হয়নি বা এদেশের মাটিতেও জন্মেনি। এটা মানুষের মনে জন্মে এবং এই মনকে এক ভালবাসা ছাড়া জয় করতে পারে এমন কোন শক্তিই নেই।
ভালবাসার প্রকৃত অর্থ যা’ই হোক, কথাটা বোধ ছিল – ‘ভাল ভাষা’। আধুনিক সভ্যতা ও শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে এ সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। ইতিহাসের থেকে দেখতে গেলে আমরা পাই- আদিম অধিবাসী বা অনার্যদের কাহিনী। সেই অনার্যেরা যে সভ্য আর্যে পরিগনিত হয়েছিল, তার মুলেই ছিল – ‘ভাষা’। অনার্যেরা ছিল অসভ্য, তাদের আচার-ব্যবহার এবং ভাষাও ছিল তদ্রুপ। সভ্য আর্যদের ‘ভাল-ভাষাই’ অনার্যদের কোমল প্রাণে ভাল লেগেছিল। তারা আর্যদের কাছ থেকে যা শিক্ষা পেয়েছিল তা’ ভাল-ভাষা, এবং সেই ভাষাই ধীরে-ধীরে দু’টি সম্পূর্ণ অপরিচিত অন্তরকে ভালবাসার-সূত্রে আবদ্ধ করেছিল। এই ভাল-ভাষার উপরই দুনিয়ার সমূদয় কাজ চলে আসছে। পরম-শত্রুও এই ভাষার দ্বারা বশীভূত হ’তে বাধ্য হয়। মানুষ তার ভাষার মধ্য দিয়েই সমাজে পরিচিত হয়। ভাল -ভাষা যেমনি মানব মনকে সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে, মন্দ-ভাষা তেমনি আবার নিকৃষ্টতর করে তোলে। অতএব ভাল-ভাষা ছাড়া ভালবাসা জন্মিতে পারে না।

Leave a Reply

Categories

%d bloggers like this: